আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
শ্রীলঙ্কার সাবেক ফার্স্ট লেডি শিরান্থী রাজাপাকসেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা। শিশুদের একটি হাসপাতালের জন্য সংগ্রহ করা অনুদানের অর্থ তার দাতব্য সংস্থা আত্মসাৎ করেছে—এমন অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (৭ অক্টোবর) কলম্বো থেকে শিরান্থী রাজাপাকসেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে কমিশন টু ইনভেস্টিগেট অ্যালিগেশনস অব ব্রাইবারি অর করাপশনের (সিআইএবিওসি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের ৭৩ বছর বয়সী স্ত্রী শিরান্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার পরিচালিত সিজিলিয়া স্যাভিয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিশুদের একটি ক্যানসার হাসপাতালের পিইটি স্ক্যানার কেনার কথা বলে অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে তদন্তকারীদের দাবি, চীন সরকার আগেই ওই স্ক্যানারটি অনুদান হিসেবে দিয়েছিল।
সিআইএবিওসির এক কর্মকর্তা জানান, দাতব্য সংস্থাটির দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে শিরান্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতে হাজির করা হলে জামিনের বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত দেবেন।
শিরান্থীর আইনজীবী মনোজ গামাগে বলেন, তার মক্কেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাতব্য কাজের জন্য সংগৃহীত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
সিআইএবিওসি জানিয়েছে, দাতব্য সংস্থাটিকে প্রায় ১ কোটি শ্রীলঙ্কান রুপি বা প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল সেভিংস ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রদীপ কারিয়াবাসামেকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যথাযথ আর্থিক বিধি না মেনে সরকারি তহবিল থেকে ওই অর্থ অনুদান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসার জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন শিরান্থী। পরে দাতব্য সংস্থার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তাকে কলম্বো বিমানবন্দরে হাজির হতে বলা হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে আদালতে আবেদন করার পর গত সোমবার তিনি দেশে ফেরেন। তবে তার আগাম জামিনের শুনানি আগামী ১২ অক্টোবর হওয়ার কথা রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় শিশুদের একটি ক্যানসার হাসপাতালের পিইটি স্ক্যানার কেনার জন্য সিজিলিয়া স্যাভিয়া ফাউন্ডেশন যে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছিল, সেই অর্থের বিষয়ে শিরান্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় কর্তৃপক্ষ।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতকে বলেছেন, চীন সরকার আগেই হাসপাতালটিকে পিইটি স্ক্যানারটি অনুদান দিয়েছিল। এরপরও দাতব্য সংস্থাটি অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রাখে এবং সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে শিরান্থী সব ধরনের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রায় দুই দশক ধরে প্রভাবশালী রাজাপাকসে পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন। শিরান্থীর বড় ছেলে ও বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা নামাল রাজাপাকসে বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন। তার বাবার শাসনামলে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত একটি এয়ারবাস বিমান চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যরা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এসব মামলাকে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেছেন।
মাহিন্দা রাজাপাকসে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২২ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে তার ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে ক্ষমতা ছাড়েন। এরপর পরিবারটির রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলেও মাহিন্দা রাজাপাকসে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন।
রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি ২০১৯ সালের ইস্টার সানডের বোমা হামলার পর মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ওই হামলায় প্রায় ২৭০ জন নিহত হন। হামলার পর রাজাপাকসে পরিবারের পক্ষ থেকে মুসলিমদের দায়ী করার অভিযোগ ওঠে। একই বছর গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।
পরে শ্রীলঙ্কার অপরাধ তদন্ত বিভাগ ওই হামলার ঘটনায় ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগে দেশটির সাবেক গোয়েন্দা প্রধানকে গ্রেপ্তার করে।