আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে রাজধানী পানামা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। ভূমিকম্পের পর ৮০টিরও বেশি পরাঘাতের (আফটারশক) ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। পরিস্থিতিকে বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো। তবে প্রাথমিক প্রতিবেদনে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫৬ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ১টার দিকে এ কম্পন অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) তথ্যের বরাত দিয়ে দেশটির জাতীয় জরুরি পরিষেবা সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী পানামা সিটি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে হেরেরা প্রদেশের পিতালেজো আরিবা এলাকায়। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর কেন্দ্র। কম্পন স্থায়ী হয়েছিল প্রায় এক মিনিট।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পটির মাত্রা ৮ দশমিক ০ বলে ধারণা করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ৭ নির্ধারণ করে ইউএসজিএস। ভূপৃষ্ঠের অল্প গভীরে উৎপত্তিস্থল হওয়ায় কম্পনটি বেশ তীব্র ছিল বলে জানানো হয়েছে।
দেশটির জাতীয় জরুরি পরিষেবা সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, পানামার প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ এই ভূমিকম্পের কম্পন অনুভব করেছেন। দেশটির আয়তন প্রায় ৭৫ হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ ২৭ হাজার।
আতঙ্কে ভবন ছাড়েন বাসিন্দারা
ভূমিকম্পের পর রাজধানী পানামা সিটির বহুতল ভবনগুলো থেকে আতঙ্কিত মানুষকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে ভবন কাঁপতে এবং উঁচু ভবনের ছাদের সুইমিং পুল থেকে পানি নিচে পড়ে যেতে দেখা গেছে।
৪৬ বছর বয়সী সালোমন অ্যান্ডিয়ন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম, কারণ কম্পনটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। আলমারি, বিছানা এবং রান্নাঘরের সব ভারী জিনিসপত্র কাঁপছিল।’
মূল ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট পরাঘাতের কারণে তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো নিজের ১৫ তলা ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে হয় বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে পানামা খালের ওপর একটি সেতুকে তীব্রভাবে কাঁপতে দেখা যায়। তবে ভিডিওতে যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকা অবস্থায় সেতুটিকে অক্ষত দেখা গেছে।
সড়ক যোগাযোগে ক্ষয়ক্ষতি, বিচ্ছিন্ন শহর
ভূমিকম্পের পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা একটি বড় ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি।’
তিনি জানান, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সড়ক ধসে পড়েছে। এতে স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফার্নান্দো বয়েড জানান, হেরেরা, কোকলে ও লস সান্তোস—এই তিন প্রদেশে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলক বেশি। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লস সান্তোস প্রদেশের টোনোসি শহরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ফার্নান্দো বয়েড এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আকাশপথে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কারণ স্থলপথে যাওয়া অসম্ভব।’
এদিকে কোকলে প্রদেশের পেনোনোমে শহরের একটি দোকানের ক্যাশিয়ার ৩৮ বছর বয়সী জুয়ানা আলভিও এএফপিকে বলেন, ‘এটি ছিল ভয়াবহ। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো হয়নি। আমার মেয়ে স্কুলে আটকা পড়েছিল।’
৮০টির বেশি পরাঘাত, জারি হয়েছিল সুনামি সতর্কতা
প্রাথমিক ভূমিকম্পের পর পানামায় একের পর এক পরাঘাত অনুভূত হয়। দেশটির ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ৮০টিরও বেশি পরাঘাত রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে একটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ০-এর বেশি।
ভূমিকম্পের পর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম বাণিজ্য জলপথ পানামা খাল দেশটির ভূখণ্ডে অবস্থিত। প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযুক্তকারী এই খাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে। পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে খালটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়নি।
সাময়িক বন্ধ ছিল বিমানবন্দর
ভূমিকম্পের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পানামা সিটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে প্রতিবেশী কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও গুয়াতেমালা পানামার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি দেশটির সরকারকে সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি মোকাবিলা, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
সূত্র: এএফপি, এনডিটিভি