স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৯-এর ধলপুর কার্যালয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুতে অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং অর্থের বিনিময়ে ভুয়া তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। একটি নারী আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকা সত্ত্বেও তা বিবেচনায় না নিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি এবং ওই সনদে প্রকৃত বয়সের তুলনায় আট বছর কম দেখানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকাশিত অভিযোগে অঞ্চল-৯-এর সহকারী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক নুরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে তাঁকে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, দাপ্তরিক তদন্তের ফলাফল কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এনআইডি থাকার পরও বয়স কমিয়ে সনদ দেওয়ার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি অঞ্চল-৯ কার্যালয়ের জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত একটি নথি সাংবাদিকদের হাতে এসেছে। ওই নথিতে একজন নারী আবেদনকারীর নামে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুর তথ্য রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারীর বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও জন্মনিবন্ধনের সময় তা গোপন রাখা হয় এবং সনদে তাঁর প্রকৃত বয়সের তুলনায় আট বছর কম দেখানো হয়।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে সরকারি নথিতে তথ্যের যথার্থতা ও যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে জন্মনিবন্ধনের তথ্যের অসামঞ্জস্য কীভাবে তৈরি হলো, আবেদনকারীর দেওয়া কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং কোন প্রক্রিয়ায় সনদটি অনুমোদিত হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সনদ জালিয়াতির সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। এ ক্ষেত্রে মূল নথি, আবেদনপত্র, সংযুক্ত প্রমাণাদি এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা জরুরি।
যশোরের বাসিন্দার সনদ ডিএসসিসি থেকে ইস্যুর অভিযোগ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নারী আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানা ও জন্মস্থান যশোর সদর উপজেলায়। এ অবস্থায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৯ কার্যালয় থেকে তাঁর জন্মনিবন্ধন সনদ কীভাবে ইস্যু করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আবেদনকারীর ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই সনদ তৈরির কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে ঠিকানার প্রমাণ, আবেদনকারীর পরিচয়, জন্মস্থান এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের এখতিয়ার যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
জন্মনিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি। এ নথিতে ভুল বা অসত্য তথ্য অন্তর্ভুক্ত হলে নাগরিকের পরিচয়সংক্রান্ত রেকর্ডে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর তথ্য ও প্রয়োজনীয় দলিল যথাযথভাবে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অঞ্চল-৯ কার্যালয়ে জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত অনিয়মে সহকারী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক নুরুল ইসলামের ভূমিকা রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে তথ্য পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়াই সনদ তৈরির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া আলোচিত জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সচিব হিসেবে মোক্তার দায়িত্বে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সনদটি তৈরির প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল, কে আবেদন যাচাই করেছেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় তথ্য অন্তর্ভুক্তির দায়িত্বে কে ছিলেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানা গেলে এবং নথিপত্র যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া এবং দাপ্তরিক রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বকাল নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি আক্তার ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি অঞ্চল-৯ থেকে বদলি হয়ে বর্তমানে অঞ্চল-৩-এ কর্মরত রয়েছেন। আলোচিত সনদে তাঁর নাম বা সিল ব্যবহার করা হয়ে থাকলে, সেটি কোন সময়ে এবং কী প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সনদে তাঁর স্বাক্ষর বা সিল ব্যবহারের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তাঁর দায়িত্ব পালনকাল, বদলির তারিখ, সনদ ইস্যুর তারিখ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি মিলিয়ে দেখলেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ তদন্তের দাবি
জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য কীভাবে অন্তর্ভুক্ত বা পরিবর্তন করা হয়েছে, তা নির্ধারণ করা। আবেদনকারীর মূল কাগজপত্র, সনদ ইস্যুর রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য, অনুমোদনের ধাপ এবং পরিবর্তনের ইতিহাস পরীক্ষা করা হলে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সনদ ইস্যুর প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করার দাবি উঠেছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, অনুসন্ধানী দল প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণ সংগ্রহ করছে। সংগৃহীত তথ্য নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালামের দপ্তরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত অনিয়ম চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকদের সরকারি নথির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।