মোঃআনজার শাহ
জনস্বার্থ রক্ষা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, এমপি।
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা আয়োজিত জাতীয় সাংবাদিক মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ সুগম করতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণ করেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়, ফলে নতুন পত্রিকা প্রকাশ ও মুক্তমত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর বিকাশে ভূমিকা রাখেন। মন্ত্রীর মতে, এসব উদ্যোগ দেশের গণমাধ্যমকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা, পেশাগত স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যে নানা কল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের পেশা নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষা, মানুষের অধিকার তুলে ধরা এবং সমাজের অসংগতি চিহ্নিত করার এক মহান দায়িত্ব। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সাংবাদিকেরা সরকারি কার্যক্রমকে আরও জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে পারেন।
গণমাধ্যমের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, দেশে এখন নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার এবং টেলিভিশন চ্যানেল ৩৭টি। একসময় সংবাদের জন্য মানুষের ভরসা ছিল সংবাদপত্র ও বেতার। এরপর এল স্যাটেলাইট টেলিভিশন। এখন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর, ছবি ও ভিডিও নিমেষে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাচ্ছে।
তবে তথ্যপ্রবাহের এই বিস্তারের সঙ্গে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর ঝুঁকিও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় তথ্যের সত্যতা যাচাই, সাংবাদিকতার নৈতিকতা অনুসরণ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়েই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন সম্ভব। গণমাধ্যম, সরকার ও নাগরিক সমাজ পরস্পরের সহযোগিতায় এগিয়ে এলে একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতায় দক্ষতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদও দেন তিনি।
সাংবাদিকদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, বরাদ্দ ও সহায়তা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব; এখানে অনিয়ম বা পক্ষপাতের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
সাংবাদিকতার মানোন্নয়নের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। চিকিৎসক বা আইনজীবীর মতো সাংবাদিকদেরও প্রয়োজনীয় পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। পেশাগত মর্যাদা ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনার ভিত্তিতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান তিনি।
মহাসমাবেশে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার সংসদকে রাজনীতি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থেকে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্য শুনছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসন ও জাতীয় বিষয়ে ঐকমত্য গড়ার সুযোগ রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আলোচনা ও মতপ্রকাশের পথ সব সময় খোলা থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ ও জুলাই অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দুটি এক বিষয় নয় এবং এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সরকার জুলাই সনদে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে চায়। সনদের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে বিরোধী দলকে আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত এবং জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার বিকল্প নেই বলেও জানান মন্ত্রী।
সবশেষে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সাংবাদিকদের ঐক্য, পেশাগত দক্ষতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে দেশের গণমাধ্যম আরও শক্তিশালী হবে এবং গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনস্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার এ মহাসমাবেশ সাংবাদিকদের ঐক্য ও সৌহার্দ্য বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।