আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরাজিত করে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসন পেরিয়ে জয় পেয়েছে দলটি। এর ফলে দীর্ঘ সময় পর কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। অন্যদিকে ট্রাম্পও নির্বাচনী প্রচারে বিরোধী দলের এগিয়ে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্য
সিনেট নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের পরাজিত করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এর মধ্যে এমন কিছু আসন রয়েছে, যেখানে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দলটি জয় পায়নি।
টেক্সাসে জেমস তালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এবার প্যাক্সটনকে ১১ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন তালারিকো।
কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটন রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন। অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। আইওয়ায় জশ তুরেকও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।
সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার, মেইনে ট্রয় জ্যাকসন এবং ওহাইওতে শেরড ব্রাউন জয় পেয়েছেন। এসব ফলাফলের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী কয়েকটি আসনও ডেমোক্র্যাটদের দখলে এসেছে।
অন্যদিকে মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা
সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এপির তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৫ আসনের এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনে সেই সীমা অতিক্রম করে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে দলটি।
এর আগে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি, যেখানে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের সামনে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়বে নজরদারি
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা।
বিশেষ করে সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব তাদের হাতে আসায় প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, সরকারি ব্যয়, নিয়োগ এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারবে দলটি। প্রয়োজনে সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চাওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে এসব কমিটির।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা তাদের তদন্তের সাংবিধানিক ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করবে তারা।
সিনেটের স্থায়ী তদন্তবিষয়ক উপকমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথালও প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্পের পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও তদন্তের দাবি উঠতে পারে। এসব বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে নথিপত্র সংরক্ষণের অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে তদন্ত শুরু হলেই যে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, তা নয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা তদন্তের বৈধতা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। এতে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইন প্রণয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ভেটো
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও নিজেদের সব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য সহজ হবে না। কারণ, কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই পাস হতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো বিলে ভেটো দিলে সেটি কার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের একটি অংশের সমর্থন আদায় করতে হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কমানো কিংবা শুল্কনীতি পরিবর্তনের মতো বিষয়েও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়তে পারে চাপ
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কার্যকর হওয়ার আগের সময়টি ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তার আশঙ্কা, নির্বাচনে পরাজয়ের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন।
আগামী ৩ জানুয়ারির আগে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে না। এরপর যুদ্ধের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া কিংবা সামরিক অভিযানের বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে দলটি।
তবে সামরিক ব্যয় কমানোর বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে কতটা ঐকমত্য তৈরি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া বাজেটসংক্রান্ত প্রস্তাবে প্রেসিডেন্টের ভেটো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো হবে বড় পরীক্ষা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, বাড়িভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে এসব বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম কমানো, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা পুনর্বহাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে।
অর্থনীতিবিদ ডিন বেকারের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া গেলে জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে তেলের দাম ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তবে এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সম্মতি কিংবা ভেটো অকার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন প্রয়োজন হবে।
কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে মুদি পণ্য, বাড়িভাড়া ও বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির বিষয়ে বড় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমও তদন্ত করতে পারে দলটি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কংগ্রেসে হাজির করে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ট্রাম্পের সামনে চ্যালেঞ্জ
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন থেকে বিরোধী দলের শক্তিশালী নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয়, সামরিক অভিযান এবং অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রশ্ন তুলতে পারবে।
তবে তদন্ত, সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টকে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আইন প্রণয়নেও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে থাকবে।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এখন ডেমোক্র্যাটদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ট্রাম্প প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা। অন্যদিকে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করেই প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।