কক্সবাজার পৌরসভায় টমটম লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ

কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজার পৌরসভায় টমটম (ইজিবাইক) লাইসেন্স প্রদানকে কেন্দ্র করে আবারও অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত চালক ও মালিকদের বঞ্চিত করে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং সিন্ডিকেট-সংশ্লিষ্টদের নামে লাইসেন্স বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এতে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত শ্রমজীবী চালকরা, অন্যদিকে প্রশ্নের মুখে পড়েছে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও চালক সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, টমটম লাইসেন্স এখন একটি লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করে অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ফলে যারা বছরের পর বছর টমটম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তাদের অনেকেই এখনও বৈধ লাইসেন্স থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

কক্সবাজার টমটম চালক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আমানুল হক আমান বলেন, প্রকৃত চালক ও মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একাধিকবার আন্দোলন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনের দাবিকে উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে আবারও বিপুল সংখ্যক নতুন লাইসেন্স প্রদানের প্রস্তুতি চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যা নিয়ে চালক সমাজের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের লাইসেন্স কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৎকালীন পৌর প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ, লাইসেন্স ইন্সপেক্টর নুরু হক, প্রমথ পালসহ কয়েকজন ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া অবৈধভাবে লাইসেন্স গ্রহণকারী হিসেবে আলোচিত জরিপ আলীর নামও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় যেসব অনিয়ম ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের অনিয়ম ২০২৬ সালেও পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে বর্তমান পৌর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

টমটম লাইসেন্স সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে আলোচিত জরিপ আলীর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বহু চালক ও মালিকের কাছ থেকে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন। কেউ কেউ আরও বেশি অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জরিপ আলীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীরা জানান, টমটম লাইসেন্সে অনিয়ম ও অর্থ বাণিজ্যের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসনসহ একাধিক সরকারি দপ্তরে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, বর্তমানে কক্সবাজার পৌর এলাকায় চলাচলরত বহু টমটমের লাইসেন্স ও নাম্বার প্লেটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কতগুলো লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে, কতগুলো নবায়ন করা হয়েছে এবং কতগুলো বাতিল করা হয়েছে— সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় কিংবা মৌখিকভাবে তথ্য চাওয়া হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তথ্য প্রকাশ না করায় পুরো কার্যক্রম নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং টমটম চালক-মালিকদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি লাইসেন্স ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বৃহৎ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, যার সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।

তারা অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী লাইসেন্সকে কেন্দ্র করে অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের সুযোগ না পায়।

এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— টমটম লাইসেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? কারা দিচ্ছে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়? প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়ার পরও তদন্ত এগোচ্ছে না কেন? আর নীরব কেন প্রশাসন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে অপেক্ষা করছে কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক সমাজ, টমটম চালক-মালিক এবং সাধারণ জনগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *