মোঃআনজার শাহ
ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) মো. রাশেদ খাঁন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা খুঁজে বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। গোপালগঞ্জে জামায়াতের পথসভা ও দৈনিক আমার দেশের সংবাদ প্রসঙ্গেও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার বৈঠক হয়েছে বলে যে অভিযোগ তিনি প্রকাশ করেছেন, সে প্রসঙ্গে কথা বলেন রাশেদ খাঁন। তাঁর অভিযোগ, জামায়াত দিনের বেলায় ভারতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও রাতে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছে। এ বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খোলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি চ্যালেঞ্জ করছি, জামায়াত যদি প্রমাণ করতে পারে যে এ ধরনের বৈঠক হয়নি, তাহলে জনগণ যে শাস্তি দেবে, তা মাথা পেতে নেব।”
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে বলে মত দেন রাশেদ খাঁন। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের শীর্ষ নেতারা চাইলে তাঁর সঙ্গে বসে তদন্তের জন্য তথ্য নিতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিকের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ও বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল ঢুকে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। আন্দোলনে রাজনৈতিক কর্মীদের অনুপ্রবেশ, পুলিশের গাড়ি ও ব্যক্তিগত যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং কারখানায় আগুন দেওয়ার ঘটনা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত আমিরের সাম্প্রতিক লং মার্চের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “লং মার্চ থেকে সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।” তাঁর অভিযোগ, জামায়াত ও এনসিপির কিছু বক্তব্য শ্রমিক আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
কেউ সহিংসতায় উসকানি দিয়ে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “কারা জড়িত, কারা উসকানি দিয়েছে এবং কারা রাজনৈতিকভাবে এসব ঘটনাকে ব্যবহার করছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” শিল্পকারখানা, শ্রমিকদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারকে কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলের অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে জামায়াতের যে অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল, তা তাঁদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তাঁর দাবি, জামায়াতের কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অতীত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সেই সম্পর্কের নতুন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে বলে আমি মনে করি।”
গোপালগঞ্জে পথসভা না করার ঘোষণা দিয়ে জামায়াত আগে সমালোচনার মুখে পড়েছিল বলে উল্লেখ করেন রাশেদ খাঁন। তাঁর ভাষ্য, দলটির নেতারা একদিকে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় না পাওয়ার কথা বলেন, অন্যদিকে পথসভা না করার ঘোষণা দেন। প্রশ্ন ওঠার পর তাঁরা সেখানে সংক্ষিপ্ত পথসভা করেছেন।
তিনি বলেন, “সমালোচনার জবাবে তারা অন্তত সেখানে গিয়েছেন, এ জন্য তাদের কিছুটা ধন্যবাদ জানাতে চাই।” তবে ঘটনাটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দৈনিক আমার দেশ প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, একসময় মাহমুদুর রহমান পত্রিকাটিকে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, পত্রিকাটি এখন জামায়াতের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, “কোনো সংবাদমাধ্যম যখন একটি রাজনৈতিক দলের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”
নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে তিনি জানান, পত্রিকাটি তাঁকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একীভূত হওয়ার অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ করেছে। অথচ এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পত্রিকার কপি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি কোনো পত্রিকা ছিঁড়িনি। আমি একটি অসত্যকে ছিঁড়েছি, একটি মিথ্যা ন্যারেটিভের প্রতিবাদ করেছি। আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক চরিত্রহনন করা হলে প্রতিবাদ করার অধিকার আমার রয়েছে।” শেখ হাসিনাকে কটূক্তির মামলায় কারাবরণ ও রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের অবস্থান বিবেচনায় না নিয়ে তাঁকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বক্তব্যের শেষ দিকে রাশেদ খাঁন বলেন, রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসত্য তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া উচিত। তাঁর ভাষ্য, “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”
উল্লেখ্য, এসব অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী ও দৈনিক আমার দেশের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।