মো. রাজিব তালুকদার:
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ব্যস্ততম চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় আবাসিক হোটেলের আড়ালে মাদক ও দেহব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পূর্বরার ব্রিজের অপর পাশে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে কথিত এসব কর্মকাণ্ড চলে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগের তীর হোটেলটির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত বাবুল গাজীর দিকে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনের বেলায় হোটেলটি আবাসিক হোটেল হিসেবে পরিচালিত হলেও সন্ধ্যার পর এর চিত্র ভিন্ন হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নারী-পুরুষের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং হোটেলকে কেন্দ্র করে মাদকসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে হোটেলসংলগ্ন এলাকার সামাজিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তারা। স্থানীয় পথচারী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, হোটেলের আশপাশ দিয়ে চলাচলের সময় বিভিন্ন নারীকে নানা কৌশলে হোটেলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের টেনে-হিঁচড়ে হোটেলে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই এলাকায় চলাচল করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
চাকরির কথা বলে নারী আনার অভিযোগ
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গ্রামের সহজ-সরল নারীদের চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই হোটেলে নিয়ে আসা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কর্মসংস্থানের আশ্বাসে বিভিন্ন বয়সী নারীকে হোটেলে আনার পর তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক সরবরাহের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে নারীদের সঙ্গে রাতযাপনের পাশাপাশি হোটেলটিতে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা সরবরাহ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা কিছু ব্যক্তি হোটেলে অবস্থান করেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কথিত মাদক সেবন ও ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। এতে হোটেলটির স্বাভাবিক আবাসিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আবাসিক হোটেলে অবস্থান করতে আসা সাধারণ মানুষ ও পরিবারগুলোও এতে নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন। চন্দ্রা এলাকার আবাসিক হোটেলকে ঘিরে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এর আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও চন্দ্রা এলাকায় আবাসিক হোটেলে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
একাধিকবার সতর্ক করার অভিযোগ
মার্কেটের আশপাশের ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদ কমিটির সদস্যরা কথিত এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য একাধিকবার হোটেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন বলে দাবি করেছেন। তবে তাদের অভিযোগ, সতর্ক করার পরও কার্যকর কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, আবাসিক হোটেল পরিচালনার নামে যদি কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে হোটেলটির বৈধ কাগজপত্র, অতিথি নিবন্ধন, কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এবং মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।
বাবুল গাজীর বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
এদিকে বাবুল গাজীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব বিষয়ে কেউ কথা বলতে গেলে তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। সাংবাদিকদের কাছে বাবুল গাজী দাবি করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হোটেলসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে হলে থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) কাছ থেকে জানতে হবে। একই সঙ্গে ওসিকে মাসোয়ারা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার কথাও তিনি বলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে জানানো হয়েছে। ফলে বাবুল গাজীর করা কথিত দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাতে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনার অভিযোগ
অপরদিকে স্থানীয় সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি রাতের বেলায় ওই হোটেলে আশ্রয় নেন। তবে এ অভিযোগেরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের নারীদের এনে তাদের কথিত দেহব্যবসায় জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এসব অভিযোগের কারণে হোটেলটির কার্যক্রম নিয়ে এলাকায় ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আবাসিক হোটেলের আড়ালে যদি সত্যিই মাদক ও দেহব্যবসাসহ কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের আরও দাবি, হোটেলটির বৈধ কাগজপত্র, ব্যবসায়িক অনুমোদন, অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ, মাদক সংশ্লিষ্টতা এবং নারীদের সেখানে আনার অভিযোগ—সবকিছু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাবুল গাজীর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে। একইভাবে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ ও প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। উল্লেখ্য, গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও চন্দ্রা এলাকায় আবাসিক হোটেলকে ঘিরে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে চন্দ্রা এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষ আটকের ঘটনাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।