সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ১৬ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। গত দেড় বছরের মধ্যে এসব বিয়ে হয়েছে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে তিনজনের বিয়ে ভেঙে গেছে। তারা বর্তমানে বাবার বাড়িতে থেকে আবার মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বাল্যবিবাহের বিষয়ে কথা বলতে ওই ১৬ ছাত্রীর অভিভাবকদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ডাকা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন ছাত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল। এ সময় ছাত্রীদের জন্মনিবন্ধন, অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও বিয়ের কাগজপত্র যাচাই করা হয়।
পরে ইউএনও অর্ণব দত্ত অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন। আলোচনায় কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রেমের সম্পর্ক, মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পরিবারের অজ্ঞাতসারে সম্পর্কের কারণে তাঁরা মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।
এক অভিভাবক জানান, তাঁর মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক মাস আগে পরিবারের অজান্তে ওই ছেলেকে বিয়ে করে। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিবার বিয়েটি মেনে নেয়। ওই অভিভাবক ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। কাজের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকায় মেয়ের ওপর সব সময় নজর রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
আরেক অভিভাবক জানান, মুঠোফোনের মাধ্যমে তাঁর মেয়ে পঞ্চগড়ের এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গোপনে বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ওই ছেলেকে বিয়ে করে। পরে মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। ছেলেটিকে ভালো মনে হওয়ায় পরে আবার তাঁর সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। তবে বিয়েটি নিবন্ধিত হয়নি বলে জানান ওই অভিভাবক।
আরেক অভিভাবক জানান, তাঁর মেয়ের বয়স ১৫ বছর। স্থানীয় কিছু তরুণের উৎপাত নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। মেয়ের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনকে জানাননি বলেও স্বীকার করেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, কোনো ছাত্রী বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকলে বিষয়টি প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানতে হবে। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। তিনি বলেন, মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট নিয়মিত তাঁর কার্যালয়ে এলেও কোনো ছাত্রীকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষার বিষয়ে আগে তাঁকে জানানো হয়নি।
ইউএনও বলেন, কোনো ছাত্রী বিয়ের আগে ঝুঁকিতে থাকলে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন ছাত্রী ভর্তি থাকা অবস্থায় তাঁর বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না।
বৈঠক শেষে অভিভাবকদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়, মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো যাবে না এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। কেউ এ নির্দেশ অমান্য করে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠালে নিয়মিত মামলা করা হবে বলে সতর্ক করেন ইউএনও। ছাত্রীদের জন্মনিবন্ধন এবং অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য প্রশাসনের নথিতে রাখা হয়।
শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বাল্যবিবাহ হওয়া ১৬ জনই তাঁর মাদ্রাসার ছাত্রী। গত দেড় বছরের মধ্যে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনজন বর্তমানে পড়াশোনা বন্ধ রেখেছে। কোনো ছাত্রী কয়েক দিন অনুপস্থিত থাকলে শিক্ষকেরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজন হলে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন।
তিনি বলেন, আগে জানতে পারলে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। মাদ্রাসায় সচেতনতামূলক সভা ও ‘বাল্যবিবাহকে না বলুন’ প্রচারণা চালানো হয়েছে। এ জন্য একটি কমিটিও রয়েছে। তবে অনেক সময় অভিভাবকেরা মেয়ের বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। ফলে বিয়ের খবর কখনো এক-দুই মাস, আবার কখনো ছয় মাস পর জানা যায়।
সাতক্ষীরা জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, উপস্থিত অভিভাবকেরা বিয়ের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌলভি ডেকে গোপনে এসব বিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে এবং মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য শাকিবুর রহমান (বাবলা) বলেন, ৭ সেপ্টেম্বর তিনি শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে ১৬ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তথ্য সংগ্রহ করে ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা নিয়ে ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘স্মল এরিয়া এস্টিমেশন’ প্রতিবেদনেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলাটিতে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৬২ শতাংশের বেশি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সাতক্ষীরার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাল্যবিবাহের কারণে ছাত্রীদের পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার চিত্র উঠে আসে।