মোঃ আনজার শাহ :
নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পৃথক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য নারায়ণগঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ জেলা জামদানি ও পাটশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দেশের বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টস, নিটশিল্প ও অন্যান্য কলকারখানা নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ এ জেলার শিল্পকারখানা থেকে আসে।
তিনি বলেন, শিল্পনগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রে জেলা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। শিল্পায়নের পাশাপাশি এ শহরে বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, জলাবদ্ধতা, যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ নানা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।
গত ১৭ বছরে উন্নয়নের নামে বহু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নদী, জলাশয় ও কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়েছে। কথিত উন্নয়নের নামে নেওয়া অনেক প্রকল্প জনগণের কল্যাণে আসেনি; বরং অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় জনগণের করের অর্থের অপচয় হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। সীমিত ভূমির বিপরীতে আবাসনের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। একদিকে খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। এ বাস্তবতায় জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।
তিনি জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এর আগে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন ও নগরায়ণ-সংক্রান্ত কার্যক্রম রাজউকের অধীনে পরিচালিত হতো। এখন পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এ জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হবে। কার্যালয় উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়নে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
তিনি বলেন, এখন থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন পরিচালিত হবে। নদী, জলাশয় ও কৃষিজমি রক্ষা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পরিকল্পিত নগরায়ণ হবে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সততার সঙ্গে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক যেন তার প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ ও অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার সুযোগ আর থাকবে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জকে বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করার এই উদ্যোগে নাগরিকদেরও অংশীদার হতে হবে। জনগণের গঠনমূলক সহযোগিতা ও পরামর্শই উন্নয়নের পথকে আরও গতিশীল করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলাম রাগী। এতে নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য আবুল কালাম ও মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীকে দূষণমুক্ত করে একটি বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নারায়ণগঞ্জ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।