অভিযোগ ইমারত পরিদর্শক শামিমের বিরুদ্ধে, ঢাকার মানিকদীতে রাজউকের নাকের ডগায় নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণ

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর মানিকদীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে একটি ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জোনাল অফিস ৩/১-এর আওতাধীন নতুন-৪১০ (পুরাতন-২০৭/১) নম্বর ভবনে অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে দ্বিতীয় তলা নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঘটনাটি একাধিক আইন ও বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভবনের সামনে তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড নেই। নির্মাণ শ্রমিক ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয়নি সেফটিনেট ও সেফটিগার্ড।

আইন লঙ্ঘনের চিত্র:

ভবন মালিকের লঙ্ঘন: বিল্ডিং কন্সট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২-এর ধারা ১২ লঙ্ঘন। অনুমোদনহীন নির্মাণের জন্য ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, এবং ভবন অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩: ধারা ১৮৪ ও ১৮৭ অনুসারে অবৈধ নির্মাণ অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট খরচ আদায়ের বিধান।

অন্যান্য বিধিমালা: ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ (সংশোধিত ২০২৩), বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, ২০২০ এবং সংশোধিত ইমারত নির্মাণ আইন, ২০০৮ অনুযায়ী অনুমোদিত নকশা থেকে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি (ডেভিয়েশন) সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। নোটিশ প্রদান, সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার বিধান রয়েছে। সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, ইমারত পরিদর্শক শামিম ভবন মালিকের নিকট থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ভবন মালিককে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছেন। একারনে ভবন মালিক নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন। ইমারত পরিদর্শকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা দরকার।

ঘটনার বিবরণ ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া:

রাজউকের অথরাইজড অফিসার আশিক আহমেদ ভবন মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিলেও, ইমারত পরিদর্শক শামিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি হোয়াটসঅ্যাপের ক্ষুদে বার্তায়ও কোনো জবাব দেননি। ভবনটির চারপাশে অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে দ্বিতীয় তলা নির্মাণ করা হয়েছে, যা আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। ভবন মালিকের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজউকের সম্ভাব্য পদক্ষেপ:

রাজউকের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী:

প্রথমে তিন দফা ২-সি নোটিশ প্রদান।

ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ডিজাইন বাতিল, ফৌজদারি মামলা এবং অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা।
সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় রাজউক জানিয়েছে, রাজধানীতে ৩৩৮২টি ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা মানিকদীর এই ঘটনাতেও প্রযোজ্য হতে পারে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা এবং নিয়মিত আদালতে মামলা দায়েরের পথও খোলা রয়েছে।

নির্মাণ অনিয়মের পেছনের বাস্তবতা:

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজউকের পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এমন অনিয়ম বারবার ঘটছে। অনেক সময়ই নির্মাণকাজ চলাকালে যথাযথ পর্যবেক্ষণের অভাবে নকশা বিচ্যুতি ধরা পড়ে না। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা কার্যকর করতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।

গঠনমূলক প্রস্তাব ও করণীয়:

নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে রাজউককে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

নির্মাণকাজ চলাকালীন পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি জোরদার করা।

ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করে রিয়েল-টাইম নির্মাণ পর্যবেক্ষণ।

ভবন মালিকদের জন্য অনুমোদনপূর্ব সচেতনতামূলক সেমিনার ও ক্যাম্পেইন।

অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়ার জন্য হটলাইন ও অনলাইন পোর্টাল সক্রিয় রাখা।

অনিয়মে জড়িত রাজউক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।

রাজধানীর জননিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থে ইমারত নির্মাণে আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। মানিকদীর এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং বৃহত্তর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা অমূলক নয়। এখনই সময়, রাজউক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *