রিয়াদুল ইসলাম আফজাল:
গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর ভূমি অফিসকে ঘিরে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে এখন আরও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বের অভিযোগ প্রকাশের পরও ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং অভিযোগ রয়েছে, আগের মতোই নামজারি, খাজনা দাখিলা ও ভূমি রেকর্ড সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো পেতে সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘসূত্রিতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, অফিসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল সেবাগ্রহীতাদের ঘিরে ধরছে এবং দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে। তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে ফাইলের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাপ্রার্থী বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর ভেবেছিলাম হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই বদলায়নি। বরং এখন আরও সাবধানে টাকা নেওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ প্রমাণ করতে না পারে।”
অন্যদিকে, অফিসের ভেতরের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অনানুষ্ঠানিকভাবে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ে অযৌক্তিক বিলম্ব এবং বারবার নতুন কাগজপত্র চাওয়ার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফকে ঘিরেও নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন, যার ফলে প্রশাসনিক বদলির আদেশ কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, রাকিব নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ব্যক্তি অফিসের বাইরে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেয়। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও।
এদিকে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখছি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করছেন, শুধু আশ্বাস নয়—বাস্তবিক পরিবর্তনই এখন সময়ের দাবি। তারা বলছেন, ভূমি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
শ্রীপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, যিনি আগেও ভুক্তভোগী হিসেবে অভিযোগ করেছিলেন, তিনি বলেন, “আমরা চাই দ্রুত একটা নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে সাধারণ মানুষ আর কোনোদিনও ন্যায্য সেবা পাবে না।”
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ভূমি সংক্রান্ত সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে ডিজিটাল পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে, কিছু মানবাধিকার সংগঠনও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। তারা শিগগিরই ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা করছে।
সব মিলিয়ে, শ্রীপুর পৌর ভূমি অফিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন আর শুধুমাত্র স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে একটি বড় প্রশাসনিক ইস্যুতে রূপ নিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করবে এবং ভূমি সেবায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবে।