চট্টগ্রামে বিআরটিসি ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘুষ-জালিয়াতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) সংশ্লিষ্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষাকেন্দ্রকে ঘিরে অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে একটি দালাল চক্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েই প্রশ্ন তুলবে না, বরং সড়ক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার ওই পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পরীক্ষার্থী লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেন। বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক দালাল। অভিযোগ অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ধরন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এই অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মেডিকেল সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নথি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে।

বিআরটিসি পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটের সামনে অনুসন্ধানের সময় জমির নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিজেকে দালাল হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীপ্রতি ৪ হাজার টাকা ‘অফিস খরচ’ দেওয়ার কথা জানান বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ বিআরটিসির ভেতরে কর্মরত মাস্টাররোলে নিয়োজিত হাবিব নামের এক ব্যক্তির কাছে বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এই টাকা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রকাশ করা জরুরি।

জমিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দালালদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই কিংবা পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নে কঠোরতা দেখানো হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় দুর্বলতা থাকলেও অর্থের বিনিময়ে উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, দালালদের মাধ্যমে কোনো অর্থ না দিয়ে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের তুলনামূলকভাবে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সামান্য ত্রুটির কারণেও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের অনুত্তীর্ণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে একই পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য, নিয়মের অপব্যবহার এবং সরকারি সেবায় অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে, পরীক্ষাকেন্দ্রকে ঘিরে কথিত দালাল চক্রের সমন্বয়কারী হিসেবে রেদওয়ান মাহমুদ ফাহিম নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং অর্থ লেনদেনের সমন্বয় করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এবং এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত ভূমিকা নির্ধারণ করা জরুরি।

জমিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিসি গেটের বাইরে দালাল হিসেবে নূর আলম, অনিক, বিল্লা, সুমন, হেলাল, রিয়াদ ও কামাল নামের কয়েকজনসহ আরও অনেকে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করার কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী ওই কেন্দ্রে আসায় এই চক্রের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা। আদায় করা অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি একজন চালকের যানবাহন পরিচালনার যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুমোদন। ফলে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হলে অদক্ষ চালকের হাতে যানবাহন চালানোর অনুমতি যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ, প্রয়োজনীয় নথির যথাযথ যাচাই এবং পরীক্ষার্থীদের দক্ষতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিআরটিসি পরীক্ষাকেন্দ্রকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে দালালদের কার্যক্রম, কথিত অর্থ লেনদেন, পরীক্ষার ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা বাইরের ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার মতো অনিয়মের সুযোগ না থাকে, সে জন্য নজরদারি জোরদার, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *