টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

কামরুল ইসলাম:

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বুধবারও (৯ জুলাই) দিনভর অব্যাহত বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানিতে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনে চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ ৮৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। একই সময়ে পাহাড়তলীর আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে ৭৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এতে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে।

বুধবারও ডুবে গেল নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা

সারাদিনের বৃষ্টিতে বুধবারও চট্টগ্রাম নগরীর বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অতীতে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতার তেমন সমস্যা ছিল না, সেসব এলাকাতেও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে বিকেলের দিকে বৃষ্টি কমে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে অনেক এলাকার পানি নেমে যায়।

স্থানীয়রা জানান, হালিশহর, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, রেয়াজুদ্দিন বাজার, বড় দীঘির পাড়, বেপারীপাড়া, মুহুরীপাড়া, মুরাদপুর, সিএন্ডবি, মনসুরাবাদ, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, জুবিলী রোড, তিন পোলের মাথা, গোয়ালপাড়া, ষোলশহর ফরেস্ট গেট, মৌলভী পুকুরপাড় ও ঈদগাঁও এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি নগরীর একটি সড়কে নৌকা চলাচলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নগরবাসীর দুর্ভোগের চিত্র আরও স্পষ্ট করে।

চার দিনে ৮৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত

আবহাওয়া অফিসের পতেঙ্গা ও আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গায় ১৯৪ মিলিমিটার এবং আমবাগানে ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পতেঙ্গায় ১৭৯.৪ মিলিমিটার এবং আমবাগানে ২৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত তিন দিনেই চট্টগ্রামে ৬৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অপরদিকে ‘বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম’-এর তথ্যমতে, গত চার দিনে পতেঙ্গা স্টেশনে ৮৩৪ মিলিমিটার এবং আমবাগান স্টেশনে ৭৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু, ঝুঁকিতে পাহাড়ঘেঁষা বসতি

অব্যাহত বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। বুধবার নগরীতে পাহাড়ধসে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রশাসন ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

জলাবদ্ধতার সুযোগে অনেক সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাচালকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন নগরবাসী। প্রয়োজনের তাগিদে অনেক যাত্রীকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।

জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে সিডিএ চেয়ারম্যান

বুধবার জলাবদ্ধ এলাকা ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন

তিনি বলেন, “নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের দায়িত্ব অবকাঠামো উন্নয়ন করা। অতীতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এ দায়িত্ব সিডিএর ওপর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল আমাদের নেই। তাই সেনাবাহিনীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, নগরীর সব রেগুলেটর এখনও সচল নয়। সেনাবাহিনী এসব রেগুলেটরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে রেগুলেটর বা পাম্প অচল থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আগামী তিন দিন অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তর বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ৯ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

একইসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড, বাঁশখালী উপজেলা, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, বান্দরবান সদর, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলাকে ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং পার্বত্য এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।

সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত

উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং চট্টগ্রাম নদীবন্দরে ২ নম্বর নৌ-সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা ও নিচু অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীজুড়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *