নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের উত্তর সীমান্তঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ক যুক্ত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেলপথ সম্প্রসারণ, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ, নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল যাত্রীসেবা উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক এবং পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, এসব প্রকল্প সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে পঞ্চগড় ছাড়াও রাজশাহী, চিলাহাটি ও অন্যান্য ব্রডগেজ রুট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকার দিকে যেতে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক বাস্তবায়িত হলে এ পথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমবে। এতে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যাত্রার দূরত্ব কমার পাশাপাশি প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে বলে জানান তিনি।
এর ফলে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগে গতি আসবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কম খরচে ও দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইনে অগ্রাধিকার
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি বলেন, প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে ৯০১ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণ করা জমি রেলওয়েকে বুঝিয়ে দিয়েছে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
এই করিডোরের সঙ্গে শান্তাহার-বগুড়া লিংক যুক্ত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের প্রয়োজনীয় সংযোগও তৈরি হবে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথ উন্নয়নের উদ্যোগ
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় পূর্বাঞ্চলের রেলপথ উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশকে ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম শেষে মূল কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে।
আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্প ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশ ডুয়েলগেজে উন্নীত করা হলে পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
কর্মকর্তারা জানান, লাকসাম-চট্টগ্রাম মিটারগেজ ডাবল ট্র্যাককে ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাকে রূপান্তরের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একইভাবে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া মিটারগেজ ডাবল লাইনকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের জন্য ডিপিপি অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাঁদের মতে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ রেলপথকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর অবকাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দূরত্ব কমানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের রেল নেটওয়ার্ক আরও কার্যকর করতে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পও অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ কর্ড লাইনের মাধ্যমে কুমিল্লাকে সরাসরি রাজধানীর শ্যামপুরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমবে এবং যাতায়াতের সময় দুই ঘণ্টা কমতে পারে বলে জানান তিনি। প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত হয়েছে। খসড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুমোদিত হয়েছে এবং চূড়ান্ত সমীক্ষা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, কর্ড লাইনের পুরো অংশ উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমবে এবং লেভেল ক্রসিং সীমিত রেখে ট্রেনের গতি ও নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হবে। চলতি অর্থবছরে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য ডিপিপি অনুমোদনের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া লালমনিরহাট-বগুড়া ও পার্বতীপুর-কাউনিয়া-রংপুরসহ বিভিন্ন রুটকে ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। রেলওয়ের পরিকল্পনা হলো, প্রথমে প্রধান রেলপথগুলো আধুনিকায়ন করা এবং পর্যায়ক্রমে শাখা রেলপথগুলোকে মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা।
নতুন ট্রেন ও কোচ সংগ্রহের উদ্যোগ
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করতে নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। গত ১০ আগস্ট ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন উদ্বোধন করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাপথ কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে মহানগর এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলবে বলে জানানো হয়েছে। এতে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় প্রথম চালানে ১৮টি কোচ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ১২টি নতুন কোচ দিয়ে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ট্রেনটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের ডিপিপি পুনর্গঠন করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০০টি মিটারগেজ কোচ, তিনটি রিলিফ ক্রেন ও আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ মেশিন সংগ্রহের ডিপিপি প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন প্রযুক্তির আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ চালু হলে চাকা খুলে না ফেলেই ট্রেনের চাকার প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে। এতে রক্ষণাবেক্ষণে সময় কমার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা বাড়বে বলে আশা করছে রেলওয়ে।
এ ছাড়া ৭০টি লোকোমোটিভ—এর মধ্যে ৩০টি মিটারগেজ ও ৪০টি ব্রডগেজ—রক্ষণাবেক্ষণে তিন বছর মেয়াদি সার্ভিস কন্ট্রাক্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ও ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় জোর
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে। বিভিন্ন প্যাকেজে দরপত্র কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে অকেজো ও অব্যবহৃত ২০ সেট ডেমু ট্রেন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলপথ নিরাপদ করতে ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনের লেভেল ক্রসিংগুলো আন্ডারপাস বা ওভারপাসে রূপান্তরের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি ঢাকা-টঙ্গী অংশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ কার্যক্রমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল যাত্রীসেবা ও বেসরকারি বিনিয়োগ
সংশ্লিষ্টরা জানান, যাত্রীসেবায় ডিজিটাল সুবিধাও যুক্ত হচ্ছে। কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে। পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেসেও স্টারলিংকের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু হয়েছে।
রেলওয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির অংশ হিসেবে কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন বেসরকারি খাতে পরিচালনার জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের জমিতে রোলিং স্টক উৎপাদন কারখানা স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগ আহ্বানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন কোচ-লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবার উন্নয়নের মাধ্যমে রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।