মোঃআনজার শাহ:
শুধু প্রেস কার্ড গলায় ঝুলিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার দিন এবার সত্যিকার অর্থেই শেষ হতে চলেছে। দেশের গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে ভুয়া সাংবাদিকদের চিরতরে বিদায় করতে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের ন্যায্য মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন — জাতীয় ডাটাবেজে নাম না থাকলে এবং নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে কাউকে সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
আজ রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
■ সংসদে যে প্রশ্ন উঠেছিল
সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীম তাঁর লিখিত প্রশ্নে বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে গণমাধ্যমের সুষ্ঠু বিকাশ, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার পথে নানামুখী চ্যালেঞ্জ দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার রোধে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, তা তিনি জানতে চান।
■ মন্ত্রণালয়ের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা
জবাবে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার রোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ, ন্যারেটিভ তৈরি, তথ্যনীতিসহায়তা এবং মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রতি মাসে ঢাকার বাইরে চারটি এবং ঢাকায় দুটি কর্মশালা বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে। পাশাপাশি প্রতি মাসে কমপক্ষে একটি করে সাংবাদিক নেতাদের অংশগ্রহণে রাজধানীতে বিশেষ কর্মশালা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
■ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সেতুবন্ধন
মন্ত্রী জানান, দেশের অভ্যন্তরে কর্মরত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও কার্যকর যোগাযোগ ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং ও ভুয়া খবর প্রতিরোধে বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা, মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনাসভা ও সেমিনার আয়োজনের পূর্ণ প্রস্তুতি চলছে।
■ তথ্য অধিদপ্তরের গুজব প্রতিরোধ অভিযান
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের আমলে তথ্য অধিদপ্তর থেকে ইতোমধ্যে ২২টি ফটোকার্ড এবং গুজব প্রতিরোধবিষয়ক ১০টি তথ্যবিবরণী বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও নিউজ পোর্টালে প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়েছে।
■ প্রেস কাউন্সিলে বিচারাধীন আটটি অভিযোগ
প্রেস কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, কোনো সংবাদপত্র বা সংবাদ সংস্থার সাংবাদিক কিংবা সম্পাদকের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা ও জনরুচিবিরোধী সংবাদ প্রচারের অভিযোগে সংক্ষুব্ধ যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রেস কাউন্সিলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। বর্তমানে প্রেস কাউন্সিলে দায়েরকৃত মোট আটটি অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে।
■ ৩২ জেলায় সম্পন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালা
মন্ত্রী জানান, অপসাংবাদিকতা পরিহার করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চায় সাংবাদিকদের উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৩২টি জেলায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা সফলভাবে আয়োজন করেছে।
■ ডাটাবেজ ও শিক্ষাগত যোগ্যতাই হবে সাংবাদিকতার নতুন মানদণ্ড
সবশেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন, প্রকৃত সাংবাদিকদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া সাংবাদিকতা চিরতরে বন্ধ করতে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ পূর্ণাঙ্গ জাতীয় অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এই ডাটাবেজ একবার চালু হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মাত্র এক ক্লিকেই জানা যাবে — সামনের মানুষটি আসল সাংবাদিক, নাকি ভুয়া। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ডাটাবেজ নিবন্ধন — এই দুটি মানদণ্ড পূরণ না হলে কেউ আর সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারবেন না। সত্যিকারের সাংবাদিকরা তাঁদের ন্যায্য মর্যাদা ফিরে পাবেন এবং দেশের গণমাধ্যম জগতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন অধ্যায় রচিত হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।