স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকা রেশনিং দপ্তরের আওতাধীন ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ডিলারদের অনুকূলে পুনরায় টিসিবির চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের ০৬ এপ্রিল তারিখের ৬৭১/৩/৬ নম্বর স্মারকমূলে যেসব ডিলারকে ওএমএস কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, তাদেরই আবার নতুন করে বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই ডিলারদের বিরুদ্ধে ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়ম, গুদাম ব্যবস্থাপনায় গরমিল এবং সরকারি চাল বিতরণে স্বচ্ছতা লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিষয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান থাকার কথা থাকলেও, তদন্ত শেষ না হওয়া সত্ত্বেও পুনরায় টিসিবির চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এ সিদ্ধান্ত ঘিরে দপ্তরের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্তাধীন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত করা নিয়মবহির্ভূত। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে দুর্নীতির অভিযোগ আরও উৎসাহিত হতে পারে এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা রেশনিং দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী একটি চক্রের যোগসাজশে এই বরাদ্দ পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে। বিশেষ করে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে বিষয়টি নিয়ে দপ্তরের ভেতরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
একজন রেশনিং কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “তদন্তাধীন ডিলারদের পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এতে সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা হতাশ হচ্ছেন এবং পুরো ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
অন্যদিকে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আরও বেড়েছে।
এদিকে, যেসব ডিলারদের নিয়ে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাদের একটি তালিকাও সামনে এসেছে। তালিকায় রয়েছেন—
ডি-২ আকবর আলী রাফিন ট্রেডার্স, ৪/১ দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা
ডি-২ সুজিত কুমার সূত্রধর, জননী ট্রেডার্স, ২৫/১ স্বামীবাগ রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা
ডি-২ আবু সাইদ স্টোর, মোঃ আবু সাঈদ সরদার, ২৫/১১ গোলাপবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
ডি-২ মোঃ মোর্শেদ মাহমুদ, মেসার্স মা বাবার দোয়া এন্টারপ্রাইজ, ১৯ নারিন্দালেন, ঢাকা সদর-১১০০
ডি-৩ মোঃ সামিউল্লাহ পলাশ, নুহাশ স্টোর, ৭৪ ভজহরী সাহা স্ট্রিট, ওয়ারী
ডি-৩ মেসার্স সোহা স্টোর, মোঃ লাবিব উল্লাহ নুহাশ, ৬৬ ডাক্তার রাধাশ্যাম সাহা স্ট্রিট, ওয়ারী
ডি-৩ মোঃ শাহজাহান, শাহজাহান রাইস এজেন্সি, ৫৭/১ কাপ্তান বাজার, ওয়ারী
ডি-৩ শাহীন আক্তার, শাহীন স্টোর, ৫৩/৫৩/১ যোগীনগর লেন, বনগ্রাম, ঢাকা
ডি-৩ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, লুবনা এন্টারপ্রাইজ, ৬৩/৭ নবদ্বীপ বসাক লেন, লক্ষীবাজার
ডি-৬ আনোয়ার হোসেন, মোঃ শাহাবুদ্দিন খন্দকার, মোঃ রবিউল ইসলাম, ফারহান ইয়াসমিন, জুবায়ের হোসেন
ডি-৬ মোঃ আইয়ুব মন্ডল, আইয়ুব স্টোর, নবীনগর হাউজিং, মোহাম্মদপুর
ডি-৬ মরিয়ম বেগম, তামান্না এন্টারপ্রাইজ, চাঁদ উদ্যান হাউজিং, মোহাম্মদপুর
ডি-৮ মোঃ আসাদুজ্জামান, বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ, খিলগাঁও
ডি-৯ শাহরিয়া রেজা, উত্তরা, ঢাকা (ডিলার নিয়োগে অপেক্ষমান)
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তদন্তাধীন ডিলারদের এমনভাবে পুনর্বহাল করা হলে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ওএমএস ও টিসিবি কার্যক্রমে অনিয়ম আরও বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে।
জনসাধারণ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা এ ঘটনায় দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দায়ীদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।
এ ঘটনায় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে রহস্য ও উদ্বেগ দুটোই বাড়ছে।