কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে রাজু মিঞা (১৯) হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে ফটিকছড়ি থানা পুলিশ। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মূলহোতাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ও অন্যান্য আলামত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টায় ফটিকছড়ি থানাধীন ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজু মিঞা তার মালিকানাধীন ভাঙ্গারির দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। পরবর্তীতে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে গত ২৬ জানুয়ারি সকালে ধর্মপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন পেয়ারুল ইসলামের সেগুন বাগানের পশ্চিম পাশে খনখাইয়া খালের ঢালে রাজু মিঞার অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ভিকটিমের পিতা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ফটিকছড়ি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্ত ও অভিযান: ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ফটিকছড়ি থানা পুলিশ মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় একাধিক স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালী থানাধীন পাঁচথুবি এলাকা থেকে মামলার মূল আসামি মো. ফিরোজ আহাম্মদকে (৩৪) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে: আসামি ফিরোজ আহাম্মদের স্থায়ী ঠিকানা রাউজান থানা এলাকায়। তিনি ঢাকায় চাকরি করতেন এবং তার স্ত্রী ফটিকছড়ির ধর্মপুর এলাকায় পিতার বাড়িতে (বাপের বাড়ি) বসবাস করতেন। শ্বশুরবাড়িতে অবস্থানকালে আসামি তার শ্যালিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ওই নারী প্রতিবেশী রাজু মিঞার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন।
এই বিয়েকে কেন্দ্র করে আসামি ফিরোজ ও তার শাশুড়ি ফাতেমা বেগম তীব্র ক্ষোভ পোষণ করেন। সামাজিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হলেও তাদের ক্ষোভ কমেনি। একপর্যায়ে তারা রাজু মিঞাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ড: পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি রাতে আসামি ফিরোজ কৌশলে রাজু মিঞাকে তার স্ত্রীর একটি থ্রি-পিস দেওয়ার কথা বলে খনখাইয়া খালের পাড়ে ডেকে নেন। সেখানে পৌঁছানোমাত্রই ধারালো ছুরি দিয়ে রাজুর পেট, গলা ও পিঠে একাধিক আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই রাজুর মৃত্যু হয়।
হত্যার পর আসামি মৃতদেহ খালের ঢালে বালিচাপা দেন এবং হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি খালের পানিতে ফেলে দেন। রাজুর সঙ্গে থাকা থ্রি-পিসটি পাশের সেগুন বাগানে ফেলে দিয়ে তিনি প্রথমে ঢাকা ও পরে কুমিল্লায় পালিয়ে যান।
গ্রেফতার ও আলামত উদ্ধার: আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পরবর্তী অভিযানে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত অপর আসামি ফাতেমা বেগমকে (৪২) গ্রেফতার করে। একই সঙ্গে খনখাইয়া খাল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি এবং সেগুন বাগান থেকে থ্রি-পিসটি উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামি মো. ফিরোজ আহাম্মদ ইতিমধেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।