নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলমের ভারতে অবস্থান, কলকাতায় বিলাসী জীবনযাপন এবং দেশে তাঁর ব্যবসা ও সম্পদ দেখভাল নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক যুগান্তর। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্য ও ব্যবসায়িক সহযোগীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের দেখভাল করছেন। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে শাহরিয়ার আলম রাজশাহী ছেড়ে ভারতে যান। পরে থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় যাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ভারতের কলকাতার নিউটাউনে দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে নিয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে। তাঁর কাছে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও হুন্ডি ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে পত্রিকাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে রাজশাহীর তিনটি থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে। তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৬০ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেনেসাঁ গ্রুপ ও অন্যান্য ব্যবসা
যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শাহরিয়ার আলমের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ করেন এবং রেনেসাঁ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেখভাল করছেন বলে প্রতিবেদনে নাঈমুল বাশার চৌধুরী ও পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রেনেসাঁ গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ যুগান্তরকে বলেন, শাহরিয়ার আলম প্রতিষ্ঠানটির একজন শেয়ারহোল্ডার। তিনি বর্তমানে ব্যবসায় যুক্ত না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে।
এ ছাড়া ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেড ও সাউথইস্ট টেক্সটাইলস লিমিটেডে শাহরিয়ার আলমের সম্পৃক্ততা এবং বিনিয়োগের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় নাঈমুল বাশার চৌধুরী দেখভাল করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও নাঈমুল বাশারের সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি।
পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শাহরিয়ার আলমের বাবা মো. শামসুদ্দিন, ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল এবং কয়েকজন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সহযোগী তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সম্পদ দেখভাল করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
রাজশাহীতে বারিন্দ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় শাহরিয়ারের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে তাঁর বাবার দায়িত্ব থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া রাজশাহী, ঢাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শাহরিয়ার আলমের নামে বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও তুলে ধরেছে যুগান্তর। বাঘা উপজেলায় জমি কেনা এবং বরেন্দ্র এগ্রো ফার্ম প্রতিষ্ঠার পেছনে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিরোধের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের
যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহরিয়ার আলমের বাবা শামসুদ্দিন ও ভাই সাইফুল ইসলাম বাদলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি। অন্যদিকে, রেনেসাঁ গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ জানিয়েছেন, শাহরিয়ার আলম বর্তমানে ব্যবসায় সক্রিয় নন এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অন্যরা পরিচালনা করছেন।
শাহরিয়ার আলমের বিদেশে অবস্থান, সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ এবং দেশে তাঁর ব্যবসা পরিচালনার বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।