মুক্ত বাক, দায়বদ্ধ গণমাধ্যম এবং সাংবিধানিক সীমানা: সমকালীন বাংলাদেশের দর্পণ
লেখক এইচ এম হাকিম
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদটি কেবল একটি আইনি ধারা বা কাগজের অক্ষরে খোদাই করা কিছু শব্দসমষ্টি নয়, এটি মূলত একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ফুসফুস, যা সমাজকে প্রতিনিয়ত মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তার অন্যতম মূল ভিত্তিই ছিল বৈষম্যহীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। সেই পরম আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই অমোঘ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে সমকালীন বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই অনুচ্ছেদটির গভীর পাঠ গ্রহণ করি, তখন এর অন্তর্নিহিত দর্শন, প্রায়োগিক বাস্তবতা এবং অধিকার ও সীমানার মধ্যকার সূক্ষ্ম টানাপোড়েনটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবিধানের এই বিশেষ ধারাটি আমাদের যেমন অবারিত অধিকারের আকাশ উপহার দিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে সুনাগরিকত্বের অংশ হিসেবে মনে করিয়ে দিয়েছে এক গভীর ও অপরিসীম নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বগ্রাসী বিস্তার এবং তথ্যের অবাধ ও দ্রুততম প্রবাহের এই জটিল যুগে ৩৯(২) অনুচ্ছেদের প্রাসঙ্গিকতা এবং এর ভেতরে নিহিত থাকা যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধগুলোর গুরুত্ব যেকোনো ঐতিহাসিক সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।
আজকের এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে দাঁড়িয়ে ‘বাক স্বাধীনতা’ শব্দবন্ধটি আর কেবল প্রথাগত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, দেয়াল লিখন, লিফলেট বিতরণ কিংবা চিঠিপত্রের আদান-প্রদানের চিরাচরিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের হাতে এমন এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, যার ফলে প্রতিটি নাগরিকের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটি আজ এক একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত গণমাধ্যম এবং বিশ্বের বৃহত্তম মত প্রকাশের উর্বর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়েছে। নাগরিকরা এখন পলকেই তাদের মনের ক্ষোভ, আনন্দ, অধিকারের দাবি, তীব্র প্রতিবাদ কিংবা সৃজনশীল চিন্তাধারা ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স-এর মতো বৈশ্বিক মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের সামনে মুহূর্তের মধ্যে মেলে ধরতে পারছেন। এই অবাধ ও সমান্তরাল সুযোগ সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে অভূতপূর্ব মাত্রায় শক্তিশালী করেছে, যা অতীতে কখনো সম্ভব ছিল না। কিন্তু এই অভূতপূর্ব অবাধ স্বাধীনতার সমান্তরালে সমাজে তৈরি হয়েছে এক ধরণের অদৃশ্য ও গভীর বিশৃঙ্খলা। যখনই এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বিঘ্নিত করার সুগভীর ষড়যন্ত্র করা হয়, কিংবা এমন কোনো সংবেদনশীল প্রোপাগান্ডা বা ভূয়া তথ্য ছড়ানো হয় যা বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে, তখনই সংবিধানের সেই দূরদর্শী ‘যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ’-এর ঢালটি অপরিহার্য ও ঐতিহাসিক রক্ষাকবচ হিসেবে সামনে চলে আসে। বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ডিজিটাল অপপ্রচারের যুগে একটিমাত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা উস্কানিমূলক পোস্ট কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো বিভ্রান্তিকর খবর মুহূর্তের মধ্যে আমাদের জনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দিতে পারে, জনমনে তীব্র ভীতি সঞ্চার করতে পারে কিংবা সমাজে ভয়াবহ দাঙ্গা ও গোষ্ঠীগত গোলযোগ উস্কে দিতে পারে, যা সামলানো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের সংবিধানের প্রণেতাদের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা চরমভাবে প্রকাশ পায়, যা অবাধ ও বলগাহীন স্বাধীনতার নামে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এক অন্তহীন নৈরাজ্য, সহিংসতা ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানায়।
একইভাবে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টিও সমকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক নতুন এবং বহুমাত্রিক অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। গণমাধ্যমকে চিরকালই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সমান্তরালে থেকে সমাজকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে। একটি সচল, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের জন্য নির্ভীক, নিরপেক্ষ, অনুসন্ধানী এবং আপসহীন সাংবাদিকতা অপরিহার্য অক্সিজেনের মতো কাজ করে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দ্রুত বর্ধনশীল অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো যখন জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক অসংগতি কিংবা প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার গল্প তুলে ধরে, তখন তারা মূলত এই ৩৯(২) অনুচ্ছেদেরই শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক রক্ষাকবচ ধারণ করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। তবে এই মহৎ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার আড়ালে যেন কোনোভাবেই কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত সম্মানহানি না ঘটে, কারও সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ না হয়, কিংবা দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপ করে কোনো বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আগাম সমান্তরাল বিচারিক প্রক্রিয়া বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালিয়ে আদালত-অবমাননা করা না হয়—তা নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় আইনি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তথ্যের গভীর সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বিন্দুমাত্র যাচাই না করে স্রেফ সবার আগে খবর প্রকাশের অসুস্থ ও অন্ধ প্রতিযোগিতা, অথবা কেবল সস্তা ভিউ, লাইক কিংবা ক্লিক পাওয়ার হীন আশায় সমাজবিরোধী, অনৈতিক, চরম কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ ধারার সাংবাদিকতা হতে পারে না। এই ধরণের চর্চা কেবল সাংবাদিকতার মৌলিক আন্তর্জাতিক নীতিমালারই পরিপন্থী নয়, বরং তা আমাদের পবিত্র সংবিধানের মূল স্পিরিট ও চেতনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও ক্ষতিকারক।
আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই চলমান ট্রানজিশন পিরিয়ডে ৩৯(২) অনুচ্ছেদের সফল ও সার্থক বাস্তবায়ন মূলত নির্ভর করছে রাষ্ট্রশক্তি এবং সচেতন নাগরিক সমাজ—উভয় পক্ষের মধ্যকার এক অত্যন্ত পরিপক্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের ওপর। রাষ্ট্রকে যেমন সর্বদা অত্যন্ত সতর্কভাবে মনে রাখতে হবে যে, ‘যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ’-এর এই সাংবিধানিক অজুহাত বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেন কোনো অবস্থাতেই নাগরিকের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, ভিন্নমত পোষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে চিরতরে রুদ্ধ বা স্তব্ধ করে দেওয়া না হয়, কারণ ভিন্নমতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। ঠিক তেমনিভাবে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীকেও নিজ নিজ জায়গা থেকে গভীর আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মনে রাখতে হবে যে, আমার নিজস্ব স্বাধীনতার সীমা ঠিক তখনই শেষ হয়ে যায়, যেখানে অন্য একজন স্বাধীন নাগরিকের অধিকার ও সম্মানের পরিধি শুরু হয়। বর্তমান এই জটিল সাইবার যুগে কোনো কঠোর আইন প্রণয়ন বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মুখ বন্ধ করার চেয়েও সমাজে অনেক বেশি প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা জাগ্রত করা, সর্বস্তরে ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা। আমাদের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদটি নাগরিক সমাজকে কোনো সংকীর্ণ খাঁচায় বন্দি করে রাখে না, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল, সুনীল ও বিশাল আকাশের মতো, যেখানে ডানা মেলে ওড়ার অসীম স্বাধীনতা যেমন দেওয়া আছে, ঠিক তেমনিভাবে সীমানা পেরিয়ে মহাকর্ষের বাইরে গিয়ে চিরতরে শূন্যে হারিয়ে না যাওয়ার এক পরম ও নিরাপদ জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আছে। দিনশেষে, এই অনন্য সাংবিধানিক অধিকারের সঠিক, দায়িত্বশীল, পরিমিত ও দেশপ্রেমমূলক চর্চায় পারে একটি পরমতসহিষ্ণু, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং সুস্থ ও সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে, যেখানে প্রতিটি মানুষের কণ্ঠস্বর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে এবং সুরক্ষিত থাকবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা।