১৫ বছর ধরে হাজারো পাখির নিরাপদ আশ্রয় নাজিরপাড়া

 পঞ্চগড় প্রতিনিধি:

পঞ্চগড়ের বোদা পৌরসভার নাজিরপাড়া গ্রাম যেন পাখিদের এক নিরাপদ আবাসস্থল। প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর বর্ষার শুরুতে এখানে আসে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো পাখি। গাছের ডালে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে, ছানা ফুটিয়ে কয়েক মাস নিরাপদে কাটিয়ে শীতের শুরুতে আবার অন্যত্র পাড়ি জমায় তারা।

ভোরের আলো ফোটার আগেই পাখিদের ডানার ঝাপটানি ও কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। বড় বড় গাছের ডালে দেখা যায় শত শত বাসা। কোনো বাসায় সদ্যফোটা ছানা খাবারের অপেক্ষায় থাকে, আবার কোথাও মা পাখি দূর থেকে খাবার এনে ছানার মুখে তুলে দেয়। নীল আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির উড়ে চলা আর সবুজ গাছপালায় তাদের অবাধ বিচরণ মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে পাখিরা নাজিরপাড়ায় এসে আশ্রয় নেয়। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস এখানে অবস্থান করার পর নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে তারা অন্যত্র চলে যায়। বছরের পর বছর ধরে একইভাবে চলছে তাদের আগমন ও প্রত্যাবর্তন।

নাজিরপাড়ায় শামুকখোল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচরা ও ঘুঘুসহ নানা ধরনের পাখির দেখা মেলে। এর মধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শামুকখোল পাখি দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পাখিদের কলকাকলি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন।

পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠতে স্থানীয়দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান আজাদ ও সপিয়ার রহমান বলেন, ‘পাখিরা আমাদের পরম বন্ধু। বাইরে থেকে কেউ পাখি শিকার করতে এলে গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে বাধা দিই।’

তবে পাখির মলমূত্রে রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়ানোর সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হলে এ ভোগান্তি কমবে বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয় শিক্ষার্থী মানহা বলেন, প্রতিবছর পাখি দেখতে সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নাজিরপাড়ায় আসেন। বিকেলে গাছে গাছে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে দারুণ লাগে। এসব পাখি ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকদেরও উপকার করে।

দর্শনার্থী সাইফ আরেফিন বলেন, বিকেলের নাজিরপাড়ার পরিবেশ অসাধারণ। শত শত পাখির কিচিরমিচির ও মুক্ত ডানায় উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য চোখ ও মন জুড়িয়ে দেয়।

পরিবেশকর্মী ও সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম বলেন, নাজিরপাড়ায় পাখিদের এই মেলবন্ধন প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনন্য উদাহরণ। এ নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও নিধনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। পাখিগুলো যেসব গাছে বাসা বাঁধে, সেসব গাছ না কাটতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ করা হয়েছে।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন জানান, নাজিরপাড়া, মহারাজার দিঘি, ময়দানদিঘি ও নীলসাগরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর অতিথি পাখির আগমন ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে পাখিদের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *