‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে’

মাদারীপুর প্রতিনিধি:

চট্টগ্রামের ওয়াসা মোড়ে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় নিহত পুলিশ কনস্টেবল আলামিনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর পরিবারে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন মা সেলিনা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল। আমার হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে রে! আমার বাবায় জানি কত কষ্ট পাইয়া মরছে।’

নিহত আলামিন মাদারীপুর সদর উপজেলার উত্তর দুধখালী গ্রামের আব্দুল হক সরদারের ছেলে। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত আলামিনের আড়াই মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওয়াসা মোড় এলাকায় জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদের সামনে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে চেকপোস্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন কনস্টেবল আলামিন।

এ সময় সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করতে দেখে তিন যুবককে থামার সংকেত দেন পুলিশ সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে একজন পালানোর চেষ্টা করলে আলামিন মোটরসাইকেল নিয়ে মসজিদের পশ্চিম গেটের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি বাস তাঁর মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেয়।

ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন আলামিন। পরে বাসটি তাঁকে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গজ পর্যন্ত টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। সহকর্মীরা গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

ছেলের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন বাবা আব্দুল হক সরদারও। তিনি বলেন, ‘কয়দিন আগে ছুটিতে আইছিল আলামিন। শুক্রবার জুমার পরে আমার সাথে ছবি তুলেছিলাম। আমি তো বুঝি নাই যে এইডাই আমার বাবার সাথে আমার শেষ ছবি। আমার সাত সন্তানের মধ্যে আমার আলামিন ছিল সবচেয়ে নম্র-ভদ্র।’

আলামিনের একমাত্র বোন হালিমা বলেন, ‘আমার একটা ভাই পুলিশ হইছে, আমরা যে কত গর্ব করছি। আল্লাহ যে আমার ভাইরে এত তাড়াতাড়ি নিয়া যাইব, আমরা তো তা জানতাম না।’

স্বামীকে হারিয়ে আড়াই মাসের মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা আলামিনের স্ত্রী ইশরাত জাহান রিয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি এখন কীভাবে বেঁচে থাকব? আমার আড়াই মাসের মেয়ে নিয়ে কার দুয়ারে যাব? আমার মেয়ে কাকে বাবা বলে ডাকবে? আল্লাহ, তুমি আমারে এত অল্প বয়সে কী করলা?’

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আলামিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়নি। সোমবার রাত ১০টায় জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমাদের একজন পুলিশ সদস্য এভাবে চলে যাওয়া কাম্য নয়। আমি তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *