স্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (ইউআরডিও) মো. নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঋণ বিতরণের নামে অর্থ নেওয়া, প্রশিক্ষণের হলরুম ভাড়ার টাকা সমিতির হিসাবে জমা না দেওয়া, সমিতির অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন, বাড়িভাড়া পরিশোধ না করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং তদন্ত চলাকালে তাঁকে আড়াইহাজার থেকে প্রত্যাহার অথবা সাময়িক বরখাস্তের দাবি জানিয়েছে আড়াইহাজার উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ) লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মহাপরিচালক বরাবর ডাকযোগে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবিও জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে পরিচালনা পর্ষদ দাবি করেছে, আড়াইহাজার উপজেলায় ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের সময় সদস্যদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিটি ঋণের বিপরীতে প্রায় ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি এসএমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও অর্থ নেওয়ার দাবি রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করা হয় না। ফলে ঋণপ্রত্যাশী সদস্যদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে পরিচালনা পর্ষদ।
শুধু ঋণ বিতরণ নয়, প্রশিক্ষণের হলরুম ভাড়ার অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, পল্লী জীবিকায়ন কর্মসূচির আওতায় ১৪টি তিন দিনের প্রশিক্ষণের জন্য হলরুম ভাড়া বাবদ ২১ হাজার টাকা পাওনা থাকলেও সেই অর্থ ইউসিসিএর ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। একইভাবে উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের ২৫টি প্রশিক্ষণ এবং উপজেলা সমবায় দপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য হলরুম ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থও সমিতির হিসাবে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উপজেলার ‘জোড়া বাড়ি’র ভাড়া বাবদ উপজেলা তথ্য আপার কাছ থেকে ৪৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, মে মাস পর্যন্ত ওই অর্থ ব্যাংক হিসাব বা সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানতে পেরে বিআরডিবির নারায়ণগঞ্জ জেলা দপ্তরের উপপরিচালককে অবহিত করেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ইউআরডিও মো. নাজমুল ইসলাম ‘জোড়া বাড়ি’র একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ওই ফ্ল্যাটের নির্ধারিত ভাড়া বা সরকারি ফি পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি করেছে ইউসিসিএর পরিচালনা পর্ষদ।
সমিতির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ তুলেছে পরিচালনা পর্ষদ। তাদের অভিযোগ, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের অজ্ঞাতে এবং ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন চেক ইস্যু ও নগদায়ন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব অর্থ বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে কর্মচারীদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কর্মচারীদের কাছ থেকে মাসে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাঠকর্মীদের কাছ থেকে অফিসার্স ক্লাবের চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও তুলেছে পরিচালনা পর্ষদ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা দরিদ্র সমবায়ী সদস্য ও কৃষকদের সঙ্গে ইউআরডিওর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব আচরণের কারণে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে এবং সমবায় কার্যক্রমের প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে।
অভিযোগে ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের দাবি, ওই সময়ে জন্ম, মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়া হয়েছে। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সনদসংক্রান্ত প্যাড ও রেজিস্টার নিজের কার্যালয়ে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ইউআরডিওর অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের এক পিয়ন স্বাক্ষর জাল করে বিভিন্ন সনদ প্রদান করতেন। পরে ওই পিয়নের চাকরি চলে যায় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউসিসিএ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে আড়াইহাজার বিআরডিবি ও ইউসিসিএর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সমবায়ী সদস্যদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
পরিচালনা পর্ষদ তাদের আবেদনে ঋণ বিতরণের সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত, প্রশিক্ষণের হলরুম ভাড়ার অর্থের হিসাব নিরীক্ষা এবং অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইউআরডিও মো. নাজমুল ইসলামকে আড়াইহাজার থেকে প্রত্যাহার অথবা সাময়িক বরখাস্তের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ইউসিসিএ লিমিটেডের সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ (ডালিম), সহসভাপতি আবু দাইয়ান মোল্লা এবং পরিচালক আলমগীর হোসেন, মোজাম্মেল হক, গণি মোল্লা, দুলাল হোসেন, হারুন মিয়া ও সোমা আক্তারের নাম রয়েছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আড়াইহাজার উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (ইউআরডিও) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ করা হয়ে থাকলে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকার কথা। এখানে অনেক সমস্যা ছিল। আমি আসার পর এগুলো সমাধান করেছি। যারা অন্যায় আবদার নিয়ে আসে, তাদের আবদার পূরণ না করলেই অভিযোগ করে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত হলে এসব বিষয় সবাই জানতে পারবে। এজন্য একটি তদন্ত হওয়া দরকার। আমি এখানে কী কাজ করেছি, এটা সকলেই জানে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের নারায়ণগঞ্জ জেলা দপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফেরদৌসুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তাঁর কাছে আসেনি। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ আসলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ করে থাকে, তাহলে তিনি সে অনুযায়ী আমাকে নির্দেশনা দেবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।