স্টাফ রিপোর্টার:
দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যেই তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ গ্যাস সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, গ্যাস রেশনিং, বকেয়া বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ করে দেওয়া এবং নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে তাঁর চাকরিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ সময় একই বিভাগে দায়িত্ব পালন, পদায়ন এবং গ্যাস খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শাহনেওয়াজ পারভেজ বর্তমানে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিতাসের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জিটিসিএল-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজকে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাঁর নিয়োগকে কেন্দ্র করে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ওই পরিস্থিতির মধ্যে পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনা প্রহরায় শাহনেওয়াজ পারভেজ দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপিমনা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি, বদলি, পদোন্নতি আটকে রাখা এবং ঠুনকো অভিযোগে ওএসডি করার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। এমনকি কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক কর্মকর্তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. আব্দুল মান্নান, সিনিয়র সহকারী সচিব (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-৩ শাখা) সাব্বির আহমেদ এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) এস এম মাহবুব আলম।
কমিটি অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও লিখিত জবাব পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শাহনেওয়াজ পারভেজকে সহকারী প্রকৌশলী (পেট্রোলিয়াম) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি; শুধু মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থান করে তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি অর্জন এবং চাকরিতে যোগদানের সময় ওই ডিগ্রির সমতা বা ইক্যুভ্যালেন্ট সার্টিফিকেট না থাকার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্যও রয়েছে। তাঁর দাবি, পেট্রোবাংলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ ছিল এবং বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অধীনে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায়ও নাকি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ‘লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ’-এর বিষয়টি উল্লেখ থাকার কথা উঠে এসেছে। তবে কেন শেষ পর্যন্ত শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, সেই কারণ নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ ছিল না বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিটেক ডিগ্রি নিয়েও প্রশ্ন
শাহনেওয়াজ পারভেজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ভারতের ইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইনস, ধানবাদ থেকে অর্জিত তাঁর বিটেক ডিগ্রির সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন সার্টিফিকেট নিয়োগের সময় ছিল না।
তবে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য, তিনি ব্যাচেলর অব টেকনোলজি বা বি.টেক ইন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী এবং এটি চার বছর মেয়াদি হওয়ায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সমতুল্য।
অন্যদিকে তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তাঁর নিয়োগের সময় ওই সার্টিফিকেটের সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন করা হয়নি। ফলে নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সমতা নির্ধারণের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৩ বছর একই বিভাগে থাকার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, শাহনেওয়াজ পারভেজ পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে প্রায় ২৩ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সময় একই বিভাগে অবস্থান করে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্যাস সঞ্চালন ও বিপণনের সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে জিটিসিএল ও পরবর্তীতে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদায়ন ও পদোন্নতির অভিযোগও রয়েছে।
শিল্পকারখানায় সংযোগ ও লোড বৃদ্ধিতে শত শত কোটি টাকার অভিযোগ
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫০০টি অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থ লেনদেনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত ছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তবে এসব অর্থের লেনদেন ও অভিযোগের সত্যতা আদালত বা কোনো স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব বিষয়কে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাইপাস লাইন ও গ্যাস রেশনিংয়ের অভিযোগ
তিতাসের আওতাধীন বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ বাইপাস লাইন ব্যবহার করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের জন্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করেও অর্থ আদায় করা হতো। অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের চাপ বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির বকেয়া গ্যাস বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এ কারণে শাহনেওয়াজ পারভেজকে ‘কিস্তি পারভেজ’ নামে অভিহিত করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৪-এর ধারা ৮.৫.২ অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন গ্রাহকের বকেয়া বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে বকেয়া আদায়ের স্বার্থে এবং কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সারচার্জসহ কেস-টু-কেস ভিত্তিতে কিস্তি দেওয়া হয়।
একজন কর্মকর্তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
অভিযোগে প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে একই সঙ্গে ডিএমডি-গাজীপুর, ডিএমডি-ময়মনসিংহ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এবং মহাব্যবস্থাপক-গাজীপুর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, তিতাসের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মকর্তা কীভাবে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ ধরনের পদায়ন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
১৬টি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত
বৈষম্যবিরোধী পেট্রোবাংলা ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মো. আনোয়ার হোসেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে মোট ১৬টি অভিযোগ দাখিল করেন বলে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ, ভারতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে বিটেক ডিগ্রি অর্জন, সমতা সনদ ছাড়া চাকরিতে যোগদান, পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিপণনের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের অভিযোগ, একটি কোম্পানিকে শত কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ, অবৈধ শিল্প সংযোগ, পেট্রোবাংলা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে নির্বাচন, কর্মকর্তাদের হয়রানি, পিএসসি বিডিং রাউন্ডের মডেল তৈরিতে অনিয়ম এবং বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ।
এ ছাড়া এসএস-৪ ও এসএস-৯ ব্লক ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসিকে এককভাবে দেওয়ার এবং কোরিয়ান কোম্পানি দাইয়ুকে এককভাবে কাজ দেওয়ার অভিযোগও ওই অভিযোগপত্রে রয়েছে বলে জানা গেছে।
দ্বিতীয় দফায় নতুন অভিযোগ
গত ১১ মার্চ ২০২৬ পেট্রোবাংলা ও এর ১৩টি কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মো. নূর হোসেন নামে একজন সচিব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পৃথক লিখিত অভিযোগ দেন বলে অভিযোগপত্র-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে।
ওই অভিযোগে আগের অভিযোগগুলোর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা হয় বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এলডি প্রদানের মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ফেরত, হুন্দাই কোম্পানিকে ১৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, সিস্টেম লসের নামে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি, গ্যাস রেশনিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আদায়, একই কর্মকর্তাকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া, বকেয়া গ্যাস বিল কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা এবং সার্ভিস লাইন বন্ধ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ে স্বাধীনভাবে প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গ্যাস সংকটের মধ্যে অভিযোগ ঘিরে নতুন আলোচনা
এদিকে দেশে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির মধ্যে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঘিরে এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তিতাসের আওতাধীন এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহের বড় ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এবং শিল্পাঞ্চলে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, আবাসিক গ্রাহকদের রান্নায় সমস্যা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ার মতো সমস্যার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে শুধু তিতাসের অভ্যন্তরীণ অনিয়মকে দায়ী করা যায় না। গ্যাস উৎপাদন, আমদানি, এলএনজি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং জাতীয় গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার সামগ্রিক ঘাটতির মতো একাধিক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। তাই তিতাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকট—দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদেশি কোম্পানি ও অফশোর বিডিং নিয়েও অভিযোগ
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময় সাগরে অফশোর বিডিং রাউন্ডে আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন এবং একটি ভারতীয় কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া সাবেক পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন এবং সহকর্মীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, এসব বিষয়ে এর আগে একাধিক তদন্ত হলেও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ বা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে তদন্তগুলো কী পর্যায়ে ছিল এবং কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি প্রকাশ্যে না থাকায় এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও টুঙ্গিপাড়া সফর
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে পেট্রোবাংলা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে শাহনেওয়াজ পারভেজ বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। একই সময়ে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে ফুল দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
তবে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য, সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর বিপরীতে আর কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কমিশন তাঁকে সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করে। টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা হলো, সরকার যেভাবে কোনো কর্মসূচি বা কাজের নির্দেশ দেয়, একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি সেই নির্দেশনা পালন করেছেন।
শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে নানা অভিযোগ দিয়েছে এবং সেসব অভিযোগের তদন্তও হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় তদন্তের পর কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তিতে লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ ছিল। একই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও কর্মকর্তাও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর চার বছর মেয়াদি বিটেক ইন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমতুল্য।
বকেয়া গ্যাস বিল কিস্তিতে পরিশোধের অভিযোগের বিষয়েও তাঁর বক্তব্য হলো, সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় এ ধরনের সুযোগ রয়েছে এবং গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে বকেয়া আদায় ও শিল্পকারখানা বন্ধজনিত শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানোর স্বার্থে কেস-টু-কেস ভিত্তিতে কিস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
তদন্তের ফলাফল ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়োগপ্রক্রিয়া ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ। প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ এবং নিয়োগের সময় ডিগ্রির সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার কথা থাকলেও শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কারণ নথিতে উল্লেখ না থাকার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে শত শত কোটি টাকা ঘুষ, অবৈধ সংযোগ, গ্যাস রেশনিং, বাইপাস লাইন এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।
গ্যাস সংকটের সময় একটি রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে জবাবদিহি ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে কোন অভিযোগ সত্য, কোনটি অসত্য এবং কোন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো তথ্য-প্রমাণ রয়েছে—তা স্পষ্ট করা জরুরি।
তবে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ এখনো আদালত বা স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন, সরকারি নথি, আর্থিক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসের সরকারি ওয়েবসাইটে শাহনেওয়াজ পারভেজকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।