স্টাফ রিপোর্টার:
কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য ও দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। সেবাপ্রার্থীদের একাংশের অভিযোগ, সাধারণভাবে সরকারি ফি পরিশোধ করেও নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না, বরং অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অফিসটির উপপরিচালক মধুসূদন সরকারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে উচ্চমান সহকারী মো: ফরহাদুজ্জামান মানিক এবং অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মোঃ হাবিবুর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসটির ভেতরে ও বাইরে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে থাকে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পাসপোর্ট সংক্রান্ত আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের “ইশারা-ইঙ্গিত” বা অপ্রকাশ্য সংকেতের মাধ্যমে ফাইল ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন আচরণ লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয় কিংবা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়।
স্থানীয় নাগরিক ও সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন পাসপোর্ট, রি-ইস্যু, তথ্য সংশোধন কিংবা জরুরি ডেলিভারি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা পেতে হলে দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে করে স্বাভাবিক সেবা প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ।
একজন ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি সব ধরনের কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করার পর তাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে বলা হয় এবং টাকা দেওয়ার পর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পাসপোর্ট পাওয়া যায় বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চললেও প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
অন্য আরেক সেবাপ্রত্যাশীর অভিযোগ, অফিসের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। তাদের মতে, এই সিন্ডিকেট ছাড়া স্বাভাবিকভাবে দ্রুত সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, পাসপোর্ট অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তারা আরও অভিযোগ করেন, অতীতে বিভিন্ন সময় অনিয়মের বিষয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কুমিল্লা কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় পাসপোর্ট অফিস সংশ্লিষ্ট অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ আসে। তবে লিখিত অভিযোগ ও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। দুদক কর্মকর্তারা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপপরিচালক মধুসূদন সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা সরকারি নিয়ম ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন। তার দাবি অনুযায়ী, যদি কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দালালচক্রটি আবেদনকারীদের নথিপত্রে বিভিন্ন “কোডিং” বা সংকেত ব্যবহার করে, যা অভ্যন্তরীণভাবে বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেয়। এই ধরনের কার্যক্রম সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং হয়রানিমূলক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মনে করেন, সরকারি সেবা খাতে যদি দালাল নির্ভরতা তৈরি হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় সেবার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা বলেন, পাসপোর্ট একটি মৌলিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা, যা বিদেশগমন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই এ খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা উচিত নয়।
তারা আরও বলেন, অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করবে। ফলে সরকারের উচিত দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা।
সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে এই ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তৃত হতে পারে। তারা অনলাইন ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় ফাইল মনিটরিং এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেবা খাতে স্বচ্ছতা ফিরবে বলে আশা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সেবাপ্রার্থীরা।