মোঃ আনজার শাহ
কৃতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি মাদক, কিশোর গ্যাং ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ১৩ নম্বর আদ্রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম লিমন।
সম্প্রতি আদ্রা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রতন কুমার সাহা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম লিমন। তবে অনুষ্ঠানের ব্যানারে সভাপতির নাম মো. রাকিবুল হাসান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ:
অনুষ্ঠানে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পর্যায়ের পরীক্ষায় এবং এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে প্রথম থেকে পঞ্চমের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীদেরও সম্মাননা জানানো হয়।
চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম লিমন বলেন, কৃতি শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনায় এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সম্মানিত করলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে।
তিনি বলেন, “আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাদের সাফল্যকে উৎসাহিত করা মানে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের ভিত শক্ত করা।”
মাদক নিয়ন্ত্রণে ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ:
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে চেয়ারম্যান বলেন, মাদক এখন সমাজের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও আইনি জটিলতার কারণে অনেক সময় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অনেকের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও হাতেনাতে মাদক উদ্ধার না হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়। এ অবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করে ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
চেয়ারম্যান লিমন আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়; সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মাদকের বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়।
মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তি বা তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক সময়ে বরুড়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের খবর প্রকাশিত হয়েছে; প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মাদক নির্মূলে কঠোরতার কথা বলা হয়েছে।
কিশোর অপরাধ ঠেকাতে সচেতনতার তাগিদ:
কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গে রাকিবুল ইসলাম লিমন বলেন, ১৩ নম্বর আদ্রা ইউনিয়নে আলাদাভাবে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব তিনি দেখছেন না। তবে মাদক কারবার ও অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর অপরাধের যোগসূত্র তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পরিবারকে সন্তানের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত কাউন্সেলিং, নৈতিক শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। অবসর সময়ে কিশোর-তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ:
অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চেয়ারম্যান বলেন, মোবাইল ফোন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না কেউ মোবাইল স্বাভাবিক কাজে ব্যবহার করছে, নাকি অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে তরুণদের একটি অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের মোহে পড়ছে। পরে তারা আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ ও পারিবারিক অশান্তির শিকার হচ্ছে। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে নতুন আইনগত বিধান রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে মাদক, কিশোর অপরাধ ও অনলাইন জুয়ার নেতিবাচক প্রভাব তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে পারে। তাই এসব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং তাদের ভবিষ্যৎকে আরও আলোকিত করে তোলা। অনুষ্ঠানের ব্যানারে ব্যবহৃত স্লোগান “শিক্ষাই আলোকে করুক ভবিষ্যৎ” আয়োজকদের সেই প্রত্যয়েরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।