চাঁপাপুর ভূমি অফিসে এক লাখ টাকা ঘুষে চার লাখের খাজনা কমানোর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ঘুষ ছাড়া ভূমিসংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী ভূমিমালিক। তাদের অভিযোগ, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে নানা অজুহাতে ঘুষ দাবি করা হয়। এমনকি ভূমিসংক্রান্ত কাগজপত্রে ত্রুটি না থাকলেও বকেয়া খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রে ভূমিমালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি উপজেলার প্রত্যন্ত চাঁপাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আয়েশা খাতুনের বিরুদ্ধে এক লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার মাধ্যমে প্রায় চার লাখ টাকার বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর মাত্র ছয় হাজার টাকায় দফারফা করার অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে সরকার কয়েক বছর আগে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু করে। বর্তমানে ভূমির বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের অনেক কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তবে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তার যাচাই ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ থাকায় এ পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

স্থানীয় ভূমিমালিকদের অভিযোগ, অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর পরও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরাসরি যোগাযোগ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নামজারি কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই, প্রতিবেদন দেওয়া বা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কথা বলে ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে চাঁপাপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আয়েশা খাতুনের নামও ভুক্তভোগী ভূমিমালিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে।

নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাপুর ইউনিয়নের ঝাঁখর মৌজার ১৭৯৪ নম্বর দাগে এক একর ৯০ শতাংশ পুকুরের (কৃষি-২) ৪৯ বছরের ভূমি উন্নয়ন কর ও জরিমানাসহ বকেয়ার পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯০৭ টাকা। গত ২৩ সেপ্টেম্বর কর প্রদানের অনলাইন রসিদে ওই বকেয়া ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। একই রসিদে হাল দাবি হিসেবে ৭ হাজার ৬০০ টাকার তথ্যও রয়েছে।

তবে একই রসিদের আদায় বিবরণে তিন বছরের ঊর্ধ্বের বকেয়া হিসেবে ৩ হাজার ১৪৩ টাকা, গত তিন বছরের বকেয়া হিসেবে ১ হাজার ২২২ টাকা, বকেয়ার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং হাল দাবি হিসেবে ৩৮০ টাকা দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৭৯ টাকা। এ নিয়েই ঘুষের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় চার লাখ টাকার বকেয়া খাজনা ও জরিমানার বিপরীতে মাত্র ৬ হাজার ৫৭৯ টাকা আদায়ের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করে। তাদের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার বক্তব্য ভিন্ন।

চাঁপাপুর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আয়েশা খাতুন ঘুষের বিনিময়ে ভূমি উন্নয়ন কর, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অনলাইন ব্যবস্থায় এভাবে ভূমি উন্নয়ন কর কমিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অনলাইন সফটওয়্যার তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট ভূমির তথ্য দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, ওই ভূমির কিছু পরিমাণ কর আগে পরিশোধ করা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই এবং নীতিমালা অনুযায়ী বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চাঁপাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হিটলু সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু হলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ ভূমিমালিকদের ভোগান্তি কমবে না। তাদের দাবি, ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ বিষয়ে আদমদীঘি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা ভূমি প্রশাসনের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *