স্টাফ রিপোর্টার:
টঙ্গী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. ওসমান গণির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করা একাধিক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তিনি ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ওসমান গণি মণ্ডল ২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। চাকরিজীবনের শুরুতে সাধারণ জীবনযাপন করলেও বর্তমানে তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নামে ও বেনামে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক স্বাক্ষরিত এক আদেশে গাজীপুরের শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তাকে পাবনা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই বদলি আদেশ কার্যকর না করে প্রভাব খাটিয়ে পরবর্তীতে আবার গাজীপুর জেলায় সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি নিশ্চিত করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার অভিযোগ করেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বদলি আদেশ পরিবর্তনের ঘটনা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হয়েছিল। তাদের দাবি, ওসমান গণি দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে পছন্দের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুরের শ্রীপুর, ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ এবং অন্যান্য কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়া কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দলিলের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী ঘুষের হার নির্ধারণ করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন দলিল লেখক ও সেবা গ্রহীতা।
এছাড়া কেরানীগঞ্জ মডেল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ওসমান গণির বিরুদ্ধে ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি বিএ পাসের সনদ জমা দিলেও তার প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে চাকরি পাওয়ার বিষয়েও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্যক্তিগত জীবনে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে ১৩ নম্বর সড়কে প্রায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। এছাড়া কুড়িগ্রামে নির্মাণ করেছেন ব্যয়বহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। তার আয়কর নথি ও সম্পদের হিসাব তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অন্যদিকে, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, কুপ্রস্তাব দেওয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানিয়েছেন, তার আচরণে অনেকেই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন।
বর্তমানে ওসমান গণি টঙ্গী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরি থেকে অবসরের আগে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. ওসমান গণির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যা পারেন লিখেন, আমার হাত অনেক লম্বা।” এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গণির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।