মোঃ হাসান আলী:
ঘাটাইলের ধলাপাড়া রেঞ্জের সদর বিট ও দেওপাড়া বিটে অবৈধ করাতকলে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে বনের কচি-কাঁচা গাছ। এতে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। দিনে-রাতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব করাতকলে চলছে কাঠ চেরাই। অনুমোদনহীন এসব করাতকল স্থাপন করা হয়েছে মূল সড়কের পাশে ও বনাঞ্চলের সীমানা ঘেঁষে। এসব মিলের কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। জানা গেছে, করাতকলগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলে চার শ্রেণির বন রয়েছে। সেগুলো হলো— সংরক্ষিত বন, রক্ষিত বন, ব্যক্তিমালিকানাধীন বন এবং অশ্রেণিভুক্ত বন। তবে এর বেশিরভাগই অশ্রেণিভুক্ত বনের আওতাভুক্ত।
জানা যায়, বিগত কয়েক দশকে সংরক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল ব্যাপক হারে উজাড় হয়েছে। বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে এসব বনের গাছ। বিশেষ করে পাহাড় থেকে কাঠ পরিবহন করে বিভিন্ন উপজেলায় পোড়ানো এবং করাতকলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। রাতের আঁধারে ট্রাকযোগে এসব কাঠ পাচার করা হয় ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক বন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঠ সংগ্রহ করা হচ্ছে আশপাশের বনাঞ্চল থেকেই। যার ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চল এবং বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পাহাড়।
বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৯ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো সুযোগ বা অনুমতি নেই। তবে এসবের তোয়াক্কা করছেন না বনখেকোরা। বনাঞ্চল ঘিরেই অবৈধভাবে করাতকল স্থাপন করে দিনে-রাতে কাটা হচ্ছে বনের কাঠ।
করাতকলের মিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি করাতকলে দৈনিক অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠ চেরাই করা হয়। সেই হিসেবে ধলাপাড়া রেঞ্জের করাতকলগুলোতে সাপ্তাহিক গড়ে অন্তত সাড়ে ২২ হাজার ঘনফুট কাঠ চেরাই হয়। বছর শেষে যার পরিমাণ প্রায় ৮০ লাখ ঘনফুট ছাড়িয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাপ্টারবাইদ বাজার, সানবান্দা রোড, জাঙ্গালিয়া রোড, বাসাবাইদ বাজার, রসুলপুর আমতলা মোড়, শোলাকিপাড়া ও দেওপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ করাতকল। যার ফলে উজাড় হচ্ছে প্রাকৃতিক বন।
এ ছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বনের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতা-গুল্ম। বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের ওপর নির্ভরশীল বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে বন বিভাগের কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। প্রাকৃতিক বন বিপন্ন হওয়ায় বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। বন ধ্বংস হওয়ায় পানির উৎস প্রায় ৬১ শতাংশ কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি ও ঝরনার পানির প্রবাহও কমে আসে। ফলে কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য।
এ বিষয়ে করাতকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বিট ম্যানেজ করেই এই করাতকলের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাই তাদের ব্যবসায় কোনো বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই এবং অবাধে করাতকল পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই এভাবেই করাতকলগুলো পরিচালিত হচ্ছে। বন বিভাগের আইন অনুযায়ী এসবের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ধলাপাড়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসাইন জানান, অবৈধ করাতকলগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে অনেকেই করাতকলের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছেন। এছাড়া বনের কাঠ পোড়ানো হলে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।