ঢাকা কলেজ প্রতিবেদক:
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে তীব্র আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। কলেজ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৫০২ জন। বিপরীতে সাতটি ছাত্রাবাসে আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৬৪টি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধার বাইরে থেকে মেসে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসিক সুবিধার সংকটের কারণে তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক মেসে পর্যাপ্ত পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় শিক্ষাজীবনও নানা সমস্যার মুখে পড়ছে। আবাসন সংকট নিরসনে নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রস্তাবটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে কলেজ প্রশাসন।
কলেজ প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, সাতটি ছাত্রাবাসে মোট ১ হাজার ৩৬৪টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে অনার্স ও মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের জন্য ৯২২টি এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৪২টি আসন বরাদ্দ।
ঢাকা কলেজের উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রাবাসে ৩২৮টি করে মোট ৬৫৬টি আসন রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণায়ন ছাত্রাবাসে ১৯২, আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে ১৩৮, পশ্চিম ছাত্রাবাসে ৯৬, শহীদ ফরহাদ ছাত্রাবাসে ১১৬ এবং বিজয়-২৪ ছাত্রাবাসে ১৬৬টি আসন রয়েছে। বিজয়-২৪ ছাত্রাবাসটি শুধু উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এবং দক্ষিণায়ন ও শহীদ ফরহাদ ছাত্রাবাস অনার্স ও মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ। অন্যদিকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছাত্রাবাসটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
আবাসিক সুবিধার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের একজন অর্থনীতি বিভাগের মোজাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আবাসন নিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। আবাসনের জন্য শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই এক ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
মোজাহিদুলের ভাষ্য, মেসের খরচ সামলাতে অনেক শিক্ষার্থীকে চাকরি করতে হচ্ছে। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মেসে পর্যাপ্ত পড়াশোনার পরিবেশ না থাকা এবং খাবারের সমস্যার কারণেও শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আবাসিক শিক্ষার্থীদের অভিযোগও কম নয়। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে একটি কক্ষে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত পড়াশোনা, বিশ্রাম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তর ছাত্রাবাসের আবাসিক শিক্ষার্থী শাকিব আল হাসান বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আবাসন নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। হলের সিট পেলেও অনেক সময় একটি কক্ষে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার সময় ও চাকরির প্রস্তুতির সময়ে আবাসিক হলের বিভিন্ন সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সিট ও কক্ষ সংকটের পাশাপাশি অপর্যাপ্ত আসবাবপত্র, বিশুদ্ধ পানির সংকট, পর্যাপ্ত পাঠকক্ষের অভাব, ছারপোকার উপদ্রব, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও স্যানিটেশন সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলগুলোতে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিয়েও নানা সমস্যা রয়েছে। মাঝেমধ্যে সাইকেল ও মোবাইল ফোন চুরির মতো ঘটনাও ঘটে বলে তারা দাবি করেন।
এ অবস্থায় আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি বিদ্যমান ছাত্রাবাসগুলোর সম্প্রসারণ, সংস্কার এবং আবাসিক পরিবেশ উন্নয়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে নতুন আবাসিক হল নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। এর আগে একটি নতুন ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এগোয়নি।
অধ্যক্ষ জানান, পরে রাজউকের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন হোস্টেল নির্মাণের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে সেই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। ছাত্রাবাস ও একাডেমিক ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় একনেকের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে একনেকে উপস্থাপন করা হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে এবং প্রস্তাবটি একনেকে গেলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার একটি ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভবন নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। সাধারণত এ ধরনের কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে। বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী আরও প্রায় তিন মাস সময় চেয়েছেন।