আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিদেশি গবেষকদের ধারণা, দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারে প্রায় ১৯০টি ওয়ারহেড থাকতে পারে। এসব অস্ত্র বহনের জন্য যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন—এই তিন ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ভারত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ (বিএএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির লেখক হ্যান্স এম. ক্রিস্টেনসেন, ম্যাট কোর্ডা, এলিয়ানা জনস ও ম্যাকেঞ্জি নাইট-বয়েল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি অনুসরণ করে আসছে। একই সঙ্গে দেশটি এমন সক্ষমতা গড়ে তুলছে, যাতে কোনো পারমাণবিক হামলার শিকার হলে কার্যকরভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারে।
তবে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা, মোতায়েনের ধরন ও অস্ত্রগুলোর কার্যকর পাল্লা সম্পর্কে দেশটি প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য দেয় না। ফলে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে স্বাধীন গবেষকদের হিসাব মূলত অনুমাননির্ভর।
বিএএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম যুদ্ধবিমানের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের তৈরি মিরাজ-২০০০ এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথভাবে তৈরি জাগুয়ার। পুরোনো জাগুয়ার যুদ্ধবিমান ধীরে ধীরে অবসরে গেলে ফ্রান্স থেকে কেনা রাফাল যুদ্ধবিমান এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতা শুধু বিমাননির্ভর নয়। স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক ব্যবস্থাও দেশটির কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের ছয়টি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর রয়েছে। এগুলো হলো—পৃথ্বী-২, অগ্নি-১, অগ্নি-২, অগ্নি-৩, অগ্নি-৪ ও অগ্নি-৫। এ ছাড়া অগ্নি প্রাইম বা অগ্নি-পি পূর্ণাঙ্গভাবে মোতায়েনের কাছাকাছি রয়েছে।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, অগ্নি-১-এর পাল্লা প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। অগ্নি-২-এর পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি, অগ্নি-৩-এর তিন হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি এবং অগ্নি-৪-এর তিন হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। অগ্নি-৫-এর পাল্লা প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার।
দীর্ঘপাল্লার অগ্নি-৫ ভারতের কৌশলগত সক্ষমতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এর দীর্ঘ পাল্লার কারণে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দূরে দেশের অভ্যন্তরেও এটি মোতায়েন করা সম্ভব। এতে সম্ভাব্য হামলা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ বাড়ে।
অগ্নি-৫-এর ক্ষেত্রে একাধিক স্বতন্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘এমআইআরভি’ প্রযুক্তির সক্ষমতাও প্রদর্শন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে একাধিক ওয়ারহেড আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠানো সম্ভব।
ভারতের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমুদ্রভিত্তিক সক্ষমতাও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশটির তৃতীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন আইএনএস অরিধামান কমিশন করা হয়েছে। এর আগে আইএনএস অরিহন্ত ও আইএনএস অরিঘাতকে বহরে যুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি সাবমেরিন নির্মাণাধীন রয়েছে। কে-৪-এর মতো সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েনের দিকে এগোচ্ছে ভারত।
পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন দীর্ঘ সময় সমুদ্রে গোপনে অবস্থান করতে পারে। ফলে প্রথম কোনো হামলায় স্থল ও আকাশভিত্তিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমুদ্রভিত্তিক ব্যবস্থা দিয়ে পাল্টা আঘাত হানার সুযোগ থাকে। এ কারণেই পারমাণবিক ত্রিমাত্রিক সক্ষমতায় সাবমেরিনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র আগে ব্যবহার না করার নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে একই সঙ্গে দেশটি ‘অ্যাসিউরড সেকেন্ড স্ট্রাইক’ বা নিশ্চিত পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ভারত নিজে থেকে পারমাণবিক সংঘাত শুরু না করার অবস্থান ধরে রাখলেও কোনো দেশ ভারতের ওপর পারমাণবিক হামলা চালালে ব্যাপক পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রাখতে চায়।
বিএএসের প্রতিবেদনে ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতার তিনটি স্তর—যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সমুদ্রভিত্তিক সাবমেরিন—মিলিয়ে একটি কার্যকর পারমাণবিক ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রকৃত আকার ও সক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনের বিভিন্ন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করছে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এর ফলে সম্ভাব্য কোনো পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে ভারতের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।