মোঃআনজার শাহ:-
কিছু স্বপ্ন মানুষ বুকে নিয়ে চলে যান। কিন্তু সেই স্বপ্ন মরে না, যদি থাকে সুযোগ্য উত্তরসূরি। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মাটিতে আজ ঠিক সেটাই ঘটেছে। একজন পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন, একজন পুত্রের অদম্য সংকল্প এবং লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা এই তিনটি সুতো আজ একসঙ্গে গেঁথে গেল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে।
বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ী ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে “এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল”। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে ৮ জুন ২০২৬ তারিখে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই নামকরণ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। আর এই অসাধারণ উদ্যোগের পেছনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও হৃদয়ের উত্তাপ রয়েছে, তিনি হলেন মরহুমের সুযোগ্য পুত্র গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং বরুড়া আসনের সংসদ সদস্য জনাব জাকারিয়া তাহের।
যে স্বপ্ন থেমে ছিল, আজ সে স্বপ্ন হাঁটছে,মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের ছিলেন বরুড়ার মাটি ও মানুষের একজন নিবেদিতপ্রাণ জনসেবক, রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য। সারাজীবন তিনি এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর বুকজুড়ে ছিল একটি স্বপ্ন বরুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র মানুষটি যেন চিকিৎসার জন্য শহরে ছুটতে না হয়ে ঘরের কাছেই উন্নত সেবা পান।
কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। স্বপ্নটি অসমাপ্ত থাকল। তবে থামল না। কারণ পিতার সেই স্বপ্নকে বুকে লালন করেই বড় হয়েছেন পুত্র জাকারিয়া তাহের। রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর আসনে আসীন হলেন, তখন সবার আগে মনে পড়ল পিতার সেই অপূরণীয় আকাঙ্ক্ষার কথা। একান্ত নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টায় তিনি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিলেন। পিতার নামে হাসপাতালের নামকরণের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে পিতার স্মৃতিকে করলেন অমর, আর বরুড়াবাসীর জন্য খুলে দিলেন উন্নত স্বাস্থ্যসেবার এক নতুন দিগন্ত।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে,স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নির্মাণ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নং-৪৫.০০.০০০০.১৫৬.৯৯.০১৮.২২-২২১) সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতাধীন কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ী ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে “এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল” নামে নামকরণ করা হলো এবং জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপসচিব মো. আরাফাত রহমান এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন।
প্রজ্ঞাপনটির অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশের জন্যও পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় চিকিৎসক আবুল বাশারের হৃদয়ের কথা,বরুড়ার বিশিষ্ট সমাজসেবক ও স্থানীয় চিকিৎসক আবুল বাশার এই সংবাদে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি জানি, এই অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসার অভাবে কতটা কষ্ট পেয়েছেন। মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সেই কষ্ট নিজের চোখে দেখেছেন, বুকে অনুভব করেছেন। তাঁর নামে এই হাসপাতালের নামকরণ শুধু একটি স্মরণ নয় এটি একটি প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের পিতার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে বরুড়াবাসীর কাছে চিরকৃতজ্ঞতার পাত্র হয়ে গেলেন।”
প্রবীণ আলেম আল্লামা ইউসুফ নিজামীর প্রতিক্রিয়া,বরুড়ার প্রখ্যাত আলেম ও সমাজসেবক আল্লামা ইউসুফ নিজামী বলেন, “মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বরুড়ার সাধারণ মানুষের আপনজন, তাদের ব্যথার সাথী। তাঁর নামে এই হাসপাতালের নামকরণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয় এটি একটি প্রজন্মের কাছে বার্তা যে, সত্যিকারের সেবার স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের পিতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে প্রমাণ করলেন যে, জনসেবার উত্তরাধিকার রক্তের মধ্যেই বহমান। এই হাসপাতাল বরুড়ার মানুষের কাছে শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয় এটি হবে ভরসার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।”
বরুড়াবাসীর চোখে আনন্দাশ্রু,এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বরুড়া উপজেলায় আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা সামান্য চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা শহরে ছুটতেন, দরিদ্র যে মায়েরা সন্তানকে কোলে নিয়ে মাইলের পর মাইল পথ পেরোতেন, বয়স্ক যে মানুষগুলো ভাঙা শরীর নিয়ে যেতেন দূরের হাসপাতালে তাদের মুখে আজ স্বস্তির হাসি। তারা বলছেন, এবার আর শহরে যেতে হবে না। ঘরের কাছেই মিলবে ভালো চিকিৎসা।
এলাকাবাসী মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তিনি শুধু পিতার নাম অমর করেননি বরুড়ার লাখো মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন। জনসাধারণের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে আন্তরিক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত কৃতজ্ঞতা।
ভবিষ্যতের পথে বরুড়া,এই হাসপাতালের নামকরণ কেবল একটি সূচনা। এলাকাবাসী প্রত্যাশা করছেন, নামকরণের পাশাপাশি হাসপাতালটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হবে। তাহলেই মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহেরের স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে।
একটি পিতার স্বপ্ন, একটি পুত্রের নিষ্ঠা আর একটি জনপদের ভালোবাসা এই তিনটি মিলে আজ বরুড়ায় রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। সেই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় চিরকাল লেখা থাকবে একটি অমর নাম এ.কে.এম. আবু তাহের।