এইচ এম হাকিম:
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ডিজিটাল বিপ্লবের অভাবনীয় অগ্রযাত্রা; অন্যদিকে আমাদের হাজার বছরের লালিত সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতি। উন্নয়নের এই জোয়ারের আড়ালে সমাজে জন্ম নিচ্ছে এক গভীর নৈতিক সংকট, যা ধীরে ধীরে আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে এক নারীর বিয়ের বহির্ভূত সন্তান লালন-পালনকে “নতুন সংস্কৃতি” হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকা এক ভয়াবহ সাংস্কৃতিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ। শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে পরিবার, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সামাজিক শুদ্ধতাই ছিল সমাজ কাঠামোর মূল ভিত্তি। সেখানে অনৈতিকতাকে “ব্যক্তিগত স্বাধীনতা”র মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
আজ এমন এক সময় এসেছে, যখন নৈতিক অবক্ষয়কে আধুনিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃত আধুনিকতা কখনোই নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার শিক্ষা দেয় না। বরং আধুনিকতার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান, মনন ও মানবিকতার বিকাশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা যে তথাকথিত আধুনিকতার চর্চা দেখছি, তা অনেকাংশেই আত্মপরিচয়হীনতা ও মূল্যবোধের সংকটকে উসকে দিচ্ছে।
পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ও তরুণ সমাজ
বর্তমান প্রজন্মের জীবনধারায় যে দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। পাশ্চাত্য সংগীত, ফ্যাশন ও উদ্দাম জীবনযাপন এখন আর শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সরাসরি তরুণদের মনোজগতে প্রবেশ করেছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, শর্ট ভিডিও কনটেন্ট এবং ভাইরাল সংস্কৃতির কারণে তরুণদের মধ্যে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। মানুষ লাইক, ফলোয়ার ও ভিউয়ের নেশায় নিজের নৈতিকতা ও শালীনতাকে বিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
যে বিষয়গুলো একসময় আমাদের সমাজে অকল্পনীয় ছিল, আজ সেগুলোকে ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” করে তোলার চেষ্টা চলছে। লিভ-ইন সম্পর্ক, বিয়ের আগে অবাধ মেলামেশা কিংবা পারিবারিক শাসনের প্রতি অবজ্ঞাকে “প্রগতিশীলতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ এই বিভ্রান্তিকর প্রগতিশীলতা তরুণদের শিকড়হীন করে তুলছে এবং তাদের আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলছে।
কিশোর গ্যাং ও পারিবারিক ব্যর্থতা
সমাজের বর্তমান বাস্তবতায় “কিশোর গ্যাং” এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের উশৃঙ্খলতা, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতার পেছনে কেবল আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, বরং পারিবারিক অবহেলাও বড় কারণ।
বর্তমান সময়ের অনেক বাবা-মা সন্তানের বস্তুগত চাহিদা পূরণ করাকেই দায়িত্বের সমাপ্তি মনে করেন। হাতে দামী স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সুবিধা ও পর্যাপ্ত অর্থ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে কিংবা ইন্টারনেটে কী ধরনের কনটেন্টে আসক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়ে অধিকাংশ পরিবারেই পর্যাপ্ত নজরদারি নেই।
পারিবারিক অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার অভাব যখন তৈরি হয়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি ও অপরাধচক্র। সন্তানকে সময় না দিয়ে কেবল আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে মানুষ করার এই ভুল মানসিকতাই সমাজকে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব
এই ভয়াবহ সাংস্কৃতিক অবক্ষয় রোধ করতে হলে কেবল আক্ষেপ করে বসে থাকলে চলবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগ।
প্রশাসনের উচিত এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় না দেওয়া, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও নৈতিক অনুভূতিতে আঘাত হানে। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি।
তবে শুধু আইন দিয়েই সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবারভিত্তিক নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। একইসঙ্গে প্রতিটি অভিভাবককে বুঝতে হবে—সন্তান কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; তারা আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজের কর্ণধার।
ঐতিহ্য রক্ষা ও সুস্থ আধুনিকতার আহ্বান
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নয়; বরং তার সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারিবারিক বন্ধন ও নৈতিক মূল্যবোধে নিহিত। আমরা যদি আধুনিক হওয়ার নামে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশাসনকে বিসর্জন দিই, তবে শেষ পর্যন্ত আমরা আত্মপরিচয়হীন এক সমাজে পরিণত হবো।
আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে বিশ্বকে গ্রহণ করতেই হবে, কিন্তু নিজের শিকড় বিসর্জন দিয়ে নয়। তরুণ সমাজের পরিবর্তন যদি নৈতিকতাবর্জিত হয়, তবে তা প্রগতি নয়—বরং অবক্ষয়।
রাষ্ট্র, সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের এখনই সোচ্চার হতে হবে। পরিবার ব্যবস্থাকে রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের হাতে একটি সুস্থ, মানবিক ও নৈতিক সমাজ তুলে দেওয়াই হোক আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। কারণ শিকড়হীন বৃক্ষ যেমন ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি নৈতিকতাহীন জাতিও পৃথিবীর বুকে দীর্ঘস্থায়ী সম্মান অর্জন করতে পারে না।