রক্তাক্ত জখম, মাথায় সেলাই, তবুও পুলিশ বলছে ‘ধর্তব্য অপরাধ নয়’: ফতুল্লা থানায় বিচারপ্রার্থীকে হয়রানির অভিযোগ

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী, ব্যুরো চিফ:

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার বিরুদ্ধে মামলা নিতে অনীহার অভিযোগ উঠেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলার শিকার হয়ে মাথায় গুরুতর জখম ও সেলাই লাগার পরও থানায় মামলা না নেওয়ায় ভুক্তভোগী হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, পুলিশ ঘটনাটিকে ‘ধর্তব্য নয়’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছে এবং ওসি ও তদন্তকারী কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আইনের প্রয়োগে প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

গত বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে ফতুল্লার লালপুর চৌধুরীপাড়া এলাকায় মোঃ সাজু পাঠান (২৭) ও তার স্ত্রী মিষ্টি (২০) প্রতিবেশীদের হামলার শিকার হন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাইস কুকারে কারেন্ট ব্যবহার করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে বিবাদি শান্তি বেগম (৫৫), সালেহা বেগম (৩৫) এবং আরও ১০-১২ জন মিলে সাজু পাঠানের ওপর হামলা চালায়। তাকে কিল-ঘুষি, লাথি ও কাঠের ডাসা দিয়ে আঘাত করা হয়, যার ফলে মাথায় রক্তাক্ত জখম হয় এবং সেলাই দিতে হয়। তার স্ত্রী মিষ্টি ও ছেলে নূর আলমকেও প্রহার করা হয়।

হামলার পর সাজু পাঠান নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তারপর তিনি ফতুল্লা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন, কিন্তু পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশের বক্তব্য: পরস্পরবিরোধী দাবি

মামলা গ্রহণে অনীহা কেন— জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সঞ্জিব জোয়াদ্দার বলেন, “মামলা নেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়, ওসি সাহেবের। আমি রক্তাক্ত অবস্থার ভিডিও, ছবি সবই ওসিকে দেখিয়েছি। তিনি বলেছেন, এটি ৩২৩ ধারার অপরাধ, ধর্তব্য নয়, তাই মামলা নেওয়া দরকার নেই।”

কিন্তু অন্যদিকে, ওসি আনোয়ার হোসেন জানান, “মাথায় সেলাই লেগেছে এ তথ্য আমার জানা নেই। সামান্য কেটে গেছে, এটা ধর্তব্য নয়। তাই মামলা নেওয়া হয়নি।” তবে অভিযোগপত্রে সেলাইয়ের কথা উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে আবার মত পাল্টে বলেন, “আমাকে সেলাইয়ের কথা কেউ বলেনি।”

মামলা নিলে কেন সমস্যা— এমন প্রশ্নে ওসি আনোয়ার জানান, “এমন মামলা নিলে প্রতিদিন ৩০টিরও বেশি মামলা নিতে হবে।” বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, “না, বাধা নেই। তবে এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনায় মামলা নেওয়া হয় না।”

পুলিশের এই মনোভাব জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে জানানো হলে ওসি আনোয়ার বলেন, “অধর্তব্য মামলায় তো আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি না, এগুলো আদালতে হয়।”

আইন বিশেষজ্ঞদের তর্ক ও সমালোচনা

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথায় সেলাই লাগার মতো আঘাত কোনোভাবেই ‘সামান্য’ বা ‘অধর্তব্য’ নয়। দণ্ডবিধির ৩২৫ বা ৩২৬ ধারায় এ ধরনের আঘাত গুরুতর অপরাধ এবং এটি একটি আমলযোগ্য মামলা, যা পুলিশ গ্রহণ করতে বাধ্য।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় মামলা নিতে বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগী চাইলে আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন।”

ভুক্তভোগীর হতাশা ও অভিযোগ

এ ঘটনায় চরম হতাশা প্রকাশ করে সাজু পাঠান বলেন, “১০-১২ জন মিলে আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে এভাবে মারধর করেছে, আমার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। এরপরও পুলিশ মামলা নিতে চাচ্ছে না। আমি ন্যায়বিচারের আশায় থানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশ এটাকে ছোট ঘটনা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, “মামলা গ্রহণে হয়তো অর্থ লেনদেন না করায় এ ধরনের আচরণ করা হচ্ছে। মাথায় সেলাই লাগলে কি সেটা ছোট আঘাত?”

ফতুল্লা থানার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ

ফতুল্লা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ নতুন নয়। গত ২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে বাদীর পরিবারের ওপর হামলার পরও ৪৮ ঘণ্টা পর পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর মিডিয়ার চাপে তিন দিন পর মামলা নিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

উদ্বেগ ও দাবি

এ ধরনের ঘটনাগুলো ফতুল্লা থানা পুলিশের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাধারণ মানুষের গুরুতর আঘাতকে ‘ছোটখাটো ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়া এবং মামলা গ্রহণে গড়িমসি করা পুলিশের দায়িত্বশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে শুধু ন্যায়বিচার নয়, জনআস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ফতুল্লা থানার বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ, তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতি ও দায়িত্ব পালনে এমন ঢিলেমি আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে বলেও অভিমত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *