সরকারি প্রজ্ঞাপন ও হাইকোর্টের আদেশের পরও স্কুল-কলেজের মাঠে মেলা

মাছুদুর রহমান আসলাম:

সরকারি পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন নিষিদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত নথির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছে একটি মানবাধিকার সংগঠন। এরপরও মেলার আয়োজন চলমান থাকায় অনুমোদনের আইনগত ভিত্তি, প্রশাসনের ভূমিকা এবং সরকারি বিধান বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মেলার অনুমোদনকে কেন্দ্র করে সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত অর্থ জমা দেওয়ার বাইরে গোপনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে গত ১৮ অক্টোবর মাসব্যাপী একটি মেলার উদ্বোধন করা হয়। অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এস.কে. পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে গত ৯ অক্টোবর শুরু হয়েছে ‘মির্জাপুর দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলা-২০২৬’। দুটি মেলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে আয়োজন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে প্রচলিত সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন বিধি বা আইনগত ক্ষমতার ভিত্তিতে তা দিয়েছে? সরকারি পরিপত্রের বিষয়টি সামনে আসার পর মেলা বন্ধ করা কিংবা অনুমোদনের বৈধতা যাচাইয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেলার আয়োজক, মাঠ ব্যবহারের অনুমতি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

সরকারি পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা নিষিদ্ধের নির্দেশনা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-৭ শাখা থেকে ২০২২ সালের ২৯ জুন ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’ জারি করা হয়। পরিপত্রটির স্মারক নম্বর ২৬.০০.০০০০.১০৬.৮৬.০৮৬.১৫.১১১। এতে ৫(চ) ধারায় বলা হয়েছে, “কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন করা যাবে না।” পরিপত্রের এই নির্দেশনার আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমোদন দেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষ করে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে, মাঠটির প্রকৃত পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথিতে থাকার কথা। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মাসব্যাপী মেলার উদ্বোধন এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এস.কে. পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলা চলার বিষয়টি সামনে আসায় পরিপত্রটির প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পরও যদি কোনো আয়োজন চলতে থাকে, তাহলে তার আইনগত ভিত্তি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।

হাইকোর্টের আদেশসংক্রান্ত নথি পাঠানোর দাবি

এদিকে, বরিশালের পরেশ সাগর মাঠসংক্রান্ত রিট পিটিশন নম্বর ৬২৫৯/২০২৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ মে ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টের একটি আদেশ জারি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে বিষয়টি শুনানি হয়। একটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, আদালতের আদেশসংক্রান্ত নথি, সরকারি পরিপত্র এবং আপত্তির বিষয়টি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকদের জানানো হয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি তুলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিও পাঠানো হয়। তবে আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, আদেশটি কোন পক্ষের ওপর কী নির্দেশনা আরোপ করেছে এবং মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মেলার ক্ষেত্রে তা সরাসরি প্রযোজ্য কি না, তা মূল আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো বার্তা ও নথি গ্রহণের বিষয়টিও যাচাই করা দরকার। মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, সরকারি পরিপত্র ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত নথির বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও মেলার আয়োজন অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সিংগাইরে জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মাসব্যাপী মেলা

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে গত ১৮ অক্টোবর মাসব্যাপী মেলার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে মেলার অনুমোদন, মাঠ ব্যবহারের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। মানবাধিকার সংগঠনটির ভাষ্য, মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক প্রাথমিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপে মাঠটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ নয় বলে মন্তব্য করেন। পরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে মাঠের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, সরকারি পরিপত্র এবং অন্যান্য নথি পাঠানো হলেও আর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠের প্রকৃত ও সরকারি পরিচয় কী, মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষ মাঠ ব্যবহারের অনুমতি কার কাছ থেকে নিয়েছে, অনুমোদনপত্রে কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে এবং অনুমোদন দেওয়ার সময় ২০২২ সালের মেলা পরিপত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া প্রয়োজন। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতি ও বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও শুধু উপস্থিতির ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং মেলা আয়োজনের বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি, মাঠ ব্যবহারের চুক্তি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

মির্জাপুরে দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলা নিয়ে প্রশ্ন

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এস.কে. পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে গত ৯ অক্টোবর শুরু হয়েছে ‘মির্জাপুর দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলা-২০২৬’। দেওয়ান ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আয়োজনে মেলাটি চলছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রেও মেলার অনুমোদনপত্র, মাঠ ব্যবহারের শর্ত, অনুমোদন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের পরিচয় এবং সরকারি বিধান অনুসরণের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে এ ধরনের আয়োজনের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া যেতে পারে, কোন বিধান অনুসরণ করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং অনুমোদনের আগে মাঠটির পরিচয় ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না। মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আয়োজক কর্তৃপক্ষ কোন শর্তে মাঠ ব্যবহার করছে, সরকারি ফি বা নির্ধারিত অর্থ জমা দিয়েছে কি না এবং অনুমোদনপত্রে উল্লেখিত শর্তগুলো অনুসরণ করছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও মাঠ ব্যবহারের চুক্তির বিষয়টিও সামনে আনা জরুরি। তবে শুধু মেলা চলার তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন লঙ্ঘন করেছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে অনুমোদনপত্র, সরকারি পরিপত্রের প্রযোজ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অনুমোদন ঘিরে গোপন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

মেলার অনুমোদনকে কেন্দ্র করে সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত অর্থ জমা দেওয়ার বাইরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বিপুল পরিমাণ অর্থ গোপনে গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি গুরুতর হলেও এখন পর্যন্ত এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ, নির্দিষ্ট লেনদেনের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া, সরকারি ফি নির্ধারণ, অর্থ জমার চালান, মাঠ ব্যবহারের চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল কত টাকা, বাস্তবে কত টাকা জমা হয়েছে, আয়োজকদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে সেই অর্থ কার কাছে ও কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মেলার স্বাভাবিক আয়-ব্যয় ও বৈধ ফি প্রদানের বিষয়টির সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগকে এক করে দেখা উচিত নয়। কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করতে সুনির্দিষ্ট তথ্য, নথি ও প্রমাণ প্রয়োজন। একইভাবে, অভিযোগের সঙ্গে যাঁদের নাম বা পদ সংশ্লিষ্ট করা হচ্ছে, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও জরুরি। মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে অনুমোদনসংক্রান্ত নথি ও অর্থ জমার হিসাব প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, সরকারি বিধান উপেক্ষা করে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে এবং এর বিনিময়ে কোনো আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জেলা প্রশাসনের কাছে যেসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন

মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দেওয়া হয়ে থাকলে কোন কর্তৃপক্ষ তা দিয়েছে? দ্বিতীয়ত, অনুমোদন দেওয়ার সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের মেলা পরিপত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না? তৃতীয়ত, মাঠের মালিকানা, ব্যবহার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় যাচাইয়ে কী ধরনের নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে? এ ছাড়া মেলার আয়োজকদের সঙ্গে মাঠ ব্যবহারের কোনো চুক্তি হয়েছে কি না, সরকারি ফি কত নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই অর্থ কোষাগারে জমা দেওয়ার চালান রয়েছে কি না এবং মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কি না, সেসব তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন। মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারি পরিপত্র ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত নথি পাঠানো হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও জানা জরুরি। নথি পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে কি না, মেলার অনুমোদন পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে কি না এবং কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মেলার অনুমোদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অযাচিত বিতর্ক নিরসনের পথও তৈরি হবে।

সরকারি বিধান বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জবাবদিহি

জেলা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজ নিজ এখতিয়ারের মধ্যে সরকারি আইন, বিধি ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। কোনো সরকারি পরিপত্রের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথিপত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ মূলত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, শরীরচর্চা ও খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে মেলা আয়োজনের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে কি না, মাঠের ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নথি, আইন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অযথা নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পরিপত্র সাধারণ নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য, তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কোনো অনুমোদন আইনসম্মত হয়ে থাকলে তার ভিত্তি প্রকাশ করা যেতে পারে। আর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

হাইকোর্টের নজরে আনার উদ্যোগ

মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা এবং আগামী ২৫ অক্টোবর শুনানির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংগঠনটির দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বৈধতা, সরকারি নির্দেশনা অনুসরণের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা আদালতের নজরে আনা হবে। তবে ২৫ অক্টোবর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে কি না, সে বিষয়ে আদালতের তালিকা বা সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেই আদালতে শুনানি নির্ধারিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সংগঠনটি মেলার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি ও অর্থ জমার হিসাব প্রকাশ, সরকারি বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও জনস্বার্থে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি

মানিকগঞ্জের সিংগাইর ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন তথ্য ও নথির ভিত্তিতে। সরকারি পরিপত্রের নির্দেশনা, আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, মেলার অনুমোদনপত্র এবং মাঠ ব্যবহারের শর্ত পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার হিসাব এবং গোপন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া না গেলে সে বিষয়টিও স্পষ্ট করা উচিত, যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ স্থায়ী ধারণায় পরিণত না হয়। সব মিলিয়ে মূল প্রশ্নগুলো হলো—সরকারি পরিপত্রের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন আইনগত ভিত্তিতে অনুমোদন দিয়েছে? সরকারি কোষাগারের বাইরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা আছে কি না? আর সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত নথি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে? এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নথিভিত্তিক জবাব পাওয়া গেলে বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও জনস্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *