সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড: দায়িত্ব, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের সময়

মোঃ আনজার শাহ:

সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া ও নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল এবং তথাকথিত সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যে এই মহান পেশার মর্যাদা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড পাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতার কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড বা পরিচয়পত্র প্রদান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।

অনলাইন সাংবাদিকতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনিবন্ধিত ও ভুয়া অনলাইন পোর্টাল। এসব পোর্টালের নেই কোনো নিবন্ধন, নেই সম্পাদকীয় নীতি, নেই পেশাদার কাঠামো। অথচ এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মতো গুরুতর অভিযোগে তাদের নাম উঠে আসছে নিয়মিত।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস হারাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে সেইসব সাংবাদিকদের, যারা দীর্ঘদিন ধরে সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের অর্জিত সম্মান ও বিশ্বাস এক মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে ভুয়া পরিচয়ধারীদের অপকর্মের কারণে।

সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড কোনো সাধারণ পরিচয়পত্র নয়। এটি দায়িত্ব, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের প্রতীক। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন সাংবাদিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া—নির্বাচন—পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। যাচাই ছাড়া এই কার্ড প্রদান মানে ভুয়া পরিচয়কে বৈধতা দেওয়া এবং অপসাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করা। এতে প্রশাসন, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিক সমাজের সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও কঠোর যাচাই ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনো গণমাধ্যমের নিবন্ধন, নিয়মিত প্রকাশনা, সম্পাদকীয় কাঠামো, সাংবাদিকের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও অতীত রেকর্ড—সবকিছু বিবেচনায় এনে তবেই এ ধরনের কার্ড প্রদান করা উচিত। অন্যথায়, এই সুযোগকে ব্যবহার করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সাংবাদিকতার নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সাংবাদিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হচ্ছে—ভুয়া অনলাইন পোর্টাল ও কথিত সাংবাদিকদের যেন কোনোভাবেই সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া না হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা হালনাগাদ করা, পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সমন্বয় এবং ভুয়া পরিচয়ধারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার নামে অপকর্ম চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো গণমাধ্যম অঙ্গন। একসময় মানুষ সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতেই আগ্রহ হারাবে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। সত্যিকারের সাংবাদিকতা টিকে থাকে দায়িত্ব, সততা ও নৈতিকতার ওপর ভর করে। ভুয়া পরিচয়, অপেশাদারিত্ব এবং স্বার্থান্ধতাকে প্রশ্রয় দিলে সেই ভিত্তিই ধসে পড়বে।

এখনই সময় স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নেওয়ার। ভুয়া অনলাইন পোর্টাল ও কথিত সাংবাদিকদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় আপসের কোনো সুযোগ নেই। কারণ সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা মানেই রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *