রিয়াদুল ইসলাম আফজাল
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদলী গ্রামের দিনমজুর সাগর (৩৩) হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, নিহতের পরিবারের প্রতি প্রাণনাশের হুমকি, যশোর-বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় সোনা চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক তদন্ত কার্যক্রমকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী শহিদুল ইসলাম শহিদ ওরফে “গোল্ড শহিদ”-এর নাম।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, স্থানীয়দের অভিযোগ, মানবাধিকার সংগঠনের কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হওয়া তদন্ত কার্যক্রমের ফলে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় কথিত অপরাধচক্রের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নিহত সাগরের পরিবার অভিযোগ করেছে, ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সাগরকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফেলে রাখা হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, ঘটনার পর মামলা না করার জন্য তাদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি চিকিৎসাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও নথিপত্রও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার প্রায় ১৮ মাস পার হলেও তারা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং কার্যকর বিচারিক অগ্রগতি দেখতে পাননি। তাদের দাবি, বিচার চাওয়ার কারণেই বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সাগর হত্যাকাণ্ডের বিচার, মামলা গ্রহণ, জড়িতদের গ্রেফতার, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত ২০ মে এবং ২ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পৃথক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে মানবাধিকার সংগঠন VARD-BANGLADESH ভার্ড-বাংলাদেশ। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রথম কর্মসূচির পরও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নিহতের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং তারা গণমাধ্যম বা মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে কথা বললেও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সাগর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যশোরের শার্শা-বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় সোনা চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম শহিদ ওরফে “গোল্ড শহিদ”-এর নাম বারবার উঠে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সূত্র, রাজনৈতিক মহল এবং বিভিন্ন অভিযোগকারী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, যশোর-বেনাপোল সীমান্তের পুটখালী, দৌলতপুর, ঘিবা, গোগা ও সাদিপুর সীমান্ত ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালান, অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা, মাদক পাচার ও চাঁদাবাজির একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। যদিও অভিযুক্তরা অতীতে বিভিন্ন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়টি তদন্তে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। এতে তদন্তের অগ্রগতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
এদিকে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে তথ্যদাতাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সীমান্ত এলাকায় চলমান বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করার পর সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে গোল্ড শহিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সেলিম রেজা বাদশা খানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং জোরপূর্বক বক্তব্য দিতে বাধ্য করার অভিযোগও সামনে এসেছে। এমনকি নিহত সাগরের বাবা মাকেও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাননাশের হমকি দিয়ে তাদের কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নেয়। ঘটনাগুলো সীমান্ত এলাকায় নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন VARD-BANGLADESH ভার্ড-বাংলাদেশ এর নির্বাহী চেয়ারম্যান এম, এস, এ রেজা জানান সাগর হত্যাকাণ্ড এবং সীমান্ত এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি সাগর হত্যাকাণ্ডের মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের গ্রেফতার, ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, যুবদলের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ এবং সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সাগর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, সীমান্তজুড়ে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিষয়গুলো এখন গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম শহিদ ওরফে “গোল্ড শহিদ” এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।