সুতা চোরাকারবারের নতুন গডফাদার বিকেএমই’র হাতেম

সুলতান মাহমুদ:

দেশীয় স্পিনিং শিল্প রক্ষা এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের প্রকৃত সুতা ব্যবসায়ী ও উৎপাদকরা। তবে এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে একটি প্রভাবশালী চক্র নতুন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারকেন্দ্রিক একটি সুতা চোরাকারবারি সিন্ডিকেট—যারা বিগত সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, তারা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বন্ড সুবিধার আড়ালে চোরাই সুতার রমরমা বাণিজ্য করেছে হাতেম সিন্ডিকেট।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস হেডিং ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০–৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা থাকায় গত কয়েক বছরে এসব সুতার আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র বন্ডের নামে আমদানি করা সুতা অবৈধভাবে খোলা বাজারে বিক্রি করেছে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানায়, “এই সিদ্ধান্ত যদি আরও আগে নেওয়া হত, তাহলে দেশীয় স্পিনিং শিল্প আজ এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হত না। বন্ডের আড়ালে চোরাই সুতা বিক্রি করে একটি চক্র রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।”

রাজনৈতিক গডফাদার ও সিন্ডিকেটের উত্থান: অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রভাব ব্যবহার করে এই চক্র দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ম্যানেজ করেই হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। এই চক্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিল বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি লিটন সাহা, যিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি। সংশ্লিষ্টদের মতে, লিটন সাহার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার ঘটনাও প্রশ্নবিদ্ধ।

নতুন মুখে পুরনো বাণিজ্য করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো: পুরনো সিন্ডিকেট ভাঙলেও তাদের বাণিজ্যিক কৌশল এখনো সক্রিয়। অভিযোগ উঠেছে, বিকেএমইএর বর্তমান বিতর্কিত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নতুন করে এই ঘৃণ্য বাণিজ্য চালু করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। একাধিক সুতা ব্যবসায়ীর অভিযোগ, “মোহাম্মদ হাতেম মূলত লিটন সাহা সিন্ডিকেটেরই উত্তরসূরি। পুরনো বন্ড অপব্যবহারকারী চক্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে হাতেম সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।”

সরকারি সিদ্ধান্তে আতঙ্কে রপ্তানিকারক সংগঠন বিকেএমইএ: বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পরপরই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘শিল্পের জন্য সংকট’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তবে প্রকৃত সুতা উৎপাদকদের দাবি, এটি মূলত অবৈধ সুবিধাভোগীদের স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা। এক স্পিনিং মিল মালিক বলে, “দেশীয় সুতা ব্যবহার বাড়লে পোশাক শিল্প ধ্বংস হবে—এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বক্তব্য। বরং এতে স্থানীয় শিল্প বাঁচবে, কর্মসংস্থান বাড়বে।”

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমদানিতে নজরদারি হবে তো? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এনবিআরকে বিল অব এন্ট্রিতে কটন ইয়ার্নের কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করা এবং এইচএস কোড অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই শঙ্কা।

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দাবি: এদিকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের তালিকা প্রকাশ, অবৈধ সুতা আমদানির অর্থপাচার তদন্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর ব্যবস্থা করা, তা না হলে নতুন মুখে পুরনো সিন্ডিকেট আবারও দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে বলে অনেক ব্যবসায়ী ধারণা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *