মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে পৃথক “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন” গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিও নেতারা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআর-এর স্থায়ী শেল্টার নির্মাণ কার্যক্রমের তীব্র বিরোধিতা করে তারা বলেছেন, এটি স্থানীয় জনমতের বিরুদ্ধে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
রোববার (১১ মে) কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত “কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন সিসিএনএফ-এর কো-চেয়ার রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি।” তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আসিয়ান (ASEAN) ফোরামে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কী আলোচনা হচ্ছে, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে—তা স্থানীয় জনগণ জানে না। সরকার এখনো এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপও উপস্থাপন করেনি।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় এনজিওগুলোকে উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিজ নিজ দেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে প্রান্তিক করে রাখা হচ্ছে।
সিসিএনএফ-এর সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ইউএনএইচসিআর ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে। অথচ এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।” তিনি দাবি করেন, বিশ্বে শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির খুবই বিরল এবং এ ধরনের উদ্যোগ নতুন রোহিঙ্গা প্রবেশকে উৎসাহিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কিছু উপকরণ পরিবেশবান্ধব নয় এবং তা স্থানীয় জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
সিসিএনএফ-এর সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ মানবিক সহায়তার বড় অংশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে যাচ্ছে। স্থানীয়করণ নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত ২৫ শতাংশ তহবিল সরাসরি স্থানীয় এনজিওদের দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।” তিনি সংসদে আইন প্রণয়ন করে স্থানীয় এনজিও ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার দাবি জানান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম অভিযোগ করেন, স্থানীয় এনজিওদের জন্য গঠিত পুল ফান্ডের বড় অংশ জাতীয় এনজিওগুলো পাচ্ছে। তিনি বলেন, “স্থানীয় এনজিওগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের কোনো সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও দাবি করেন, কক্সবাজারে কর্মরত অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকরা দায়িত্ব পালন করছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। এসব পদে বাংলাদেশি, বিশেষ করে কক্সবাজারের যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিইএইচআরডিএফ-এর প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশকর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের কারণে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এতে কক্সবাজারের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।” তিনি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে নাফ নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত এবং পুকুর খননের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তানজির উদ্দিন রনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় গঠিত রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (RCT) স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব নেই। এতে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
কম্বাইন্ড হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ডের কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বলেন, “রোহিঙ্গাদের ভেন্ডরশিপ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।” তিনি এসব কার্যক্রমের যথাযথ তদারকির দাবি জানান।
রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে প্রায় ৩০০ একর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও প্রকট হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।