আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির মহোৎসব! সহকারী নাসিমাকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

নারায়ণগঞ্জ জেলার সাতটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত হলেও আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে সম্প্রতি নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, জমির নিবন্ধন, দলিল সংশোধন, নামজারি সংক্রান্ত কার্যক্রম, মূল দলিলের নকল উত্তোলনসহ প্রায় প্রতিটি কাজে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্রের যোগসাজশে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।

স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মূল দলিলের নকল সরবরাহে নির্ধারিত ফির বাইরে কয়েকগুণ বেশি টাকা নেওয়া, এমনকি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ম্যানুয়াল-২০১৪ অনুযায়ী দলিল যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষার দায়িত্ব সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের। ম্যানুয়ালের ২৬ অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সহকারী বা অন্য কোনো কর্মচারী কর্তৃক দলিল পরীক্ষাকরণ কাঙ্ক্ষিত নয়; এ কাজ অবশ্যই নিবন্ধনকারী কর্মকর্তাকে নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আড়াইহাজারসহ জেলার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এই বিধান মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের পরিবর্তে অফিস সহকারী, মোহরার, উমেদার কিংবা অন্য কর্মচারীরা দলিল যাচাইয়ের কাজ করছেন। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অনিয়মের সুযোগ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমানে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সহকারী নাসিমা। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও দলিল সংক্রান্ত কার্যক্রমে তার প্রভাব ব্যাপক। দলিল সংক্রান্ত নানা কাজের ক্ষেত্রে তার অনুমোদন বা সংশ্লিষ্টতা ছাড়া অনেক কাজ এগোয় না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দলিল নিবন্ধনের প্রকৃত তথ্য গোপন করে কম মূল্য দেখানোর মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব কম আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব অনিয়মের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, মূল দলিলের নকল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত ফি পরিশোধ করলেও নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে দালাল বা অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের পর দ্রুত সেবা দেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে মূল দলিলের নকল কপিতে ভুয়া গ্রহীতার নাম সংযোজন, দলিলে নাম সংশোধন কিংবা তথ্য পরিবর্তনের মতো গুরুতর অনিয়মও সংঘটিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে জমি নিয়ে বিরোধ, প্রতারণা এবং জালিয়াতির ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে শুধু সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সরকারও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে সহকারী মোহরার নাসিমা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সাব-রেজিস্ট্রার সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা যোগসাজশের অভিযোগ সম্পর্কেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ কার্যক্রম, রাজস্ব ফাঁকি এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *