“বরুড়া দুইবার এতিম হয়েছে” মরহুম এ কে এম আবু তাহের ও তাঁর  পুত্র মরহুম  ইয়াহিয়া শারমিনের স্মৃতিতে অশ্রুভেজা শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্মৃতিচারণ

প্রতিবেদন : মোঃ আনজার শাহ
বরুড়া, কুমিল্লা, বাংলাদেশ

কখনো কখনো জীবন এমন কিছু ক্ষত দিয়ে যায়, যা সময়ের সাথে শুকায় না, বরং আরও গভীর হয়। বরুড়ার মানুষ সেই ক্ষতের কথা জানে। একবার নয়, দুইবার। প্রথমবার যখন তাদের প্রিয় অভিভাবক, তাদের আলো, তাদের ভরসার মানুষ মরহুম এ কে এম আবু তাহের চলে গেলেন, তখন বরুড়া কেঁদেছিল। আর দ্বিতীয়বার যখন সেই পিতারই সুযোগ্য পুত্র, সেই একই রক্তের উত্তরাধিকার, সেই একই ভালোবাসার মানুষ মরহুম আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিন বছরের শেষ দিনে বিদায় নিলেন, তখন বরুড়া যেন দ্বিতীয়বারের মতো এতিম হয়ে গেল।

পিতার চলে যাওয়ার বেদনা বুকে বহন করতে করতে বরুড়ার মানুষ যখন কিছুটা সামলে নিয়েছিল, তখনই আবার এলো সেই অসহ্য খবর। বছর শেষের রাতে নেভে গেল আরেকটি আলো। বুকের ভেতরে আবারও সেই পরিচিত শূন্যতা, সেই অসহ্য বেদনা।

★একটি পরিবার, একটি ইতিহাস, একটি বরুড়া,

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের পশ্চিম পদুয়া- সোনাইমুড়ী গ্রাম। সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটি কখনো ভাবেনি যে তার কোল থেকে এমন একটি পরিবার বের হবে, যারা শুধু বরুড়া নয়, সারা বাংলাদেশের মানচিত্রে নিজেদের নাম খোদাই করে রাখবেন। হাজী ইমাম উদ্দিনের বংশে জন্ম নেওয়া এ কে এম আবু তাহের ছিলেন সেই পরিবারের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আর সেই নক্ষত্রের আলো থেকে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি আলো, তাঁর পুত্র আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিন।

পিতা ও পুত্র। দুটি আলো। দুটি জীবন। কিন্তু একটাই স্বপ্ন। একটাই উদ্দেশ্য। মানুষের জন্য বাঁচো, মানুষের জন্য কাজ করো।

★মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় পিতার দেশপ্রেম,

১৯৭১ সাল। গোটা বাংলাদেশ তখন রক্তের সাগরে ভাসছে। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছে এই মাটির মানুষ। সেই ভয়াল দিনগুলোতে যখন অনেকেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন, তখন এ কে এম আবু তাহের দেশমাতৃকার পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পরিণতিতে হানাদারদের হাতে গ্রেফতার হলেন। কারাগারের অন্ধকারে সহ্য করলেন অমানবিক নির্যাতন। কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্যও মাথা নত করেননি। দেশকে ভালোবেসেছিলেন প্রাণের চেয়েও বেশি।

এই মানুষটি পরবর্তীতে যখন রাজনীতিতে এলেন, মানুষ বুঝল কেন তাঁকে ভালোবাসতে হয়। বিএনপির মনোনয়নে কুমিল্লা-৭ বরুড়া আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি। প্রতিটি নির্বাচনে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে বেছে নিয়েছে। কারণ তিনি শুধু ভোটের সময় আসতেন না, প্রতিটি বিপদে, প্রতিটি আনন্দে, প্রতিটি শোকে বরুড়ার মানুষের পাশে থাকতেন।

তাঁর সময়েই বরুড়া পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়েছিল। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ নির্মাণে বদলে গিয়েছিল বরুড়ার চেহারা। বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা গড়ে উঠেছিল একের পর এক। অহংকারহীন এই মানুষটির দরজা দিনরাত সকলের জন্য খোলা থাকত।

★জাতীয় অর্থনীতির পথিকৃৎ, ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা,

এ কে এম আবু তাহের কেবল বরুড়ার নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সারা বাংলাদেশের একজন দূরদর্শী জাতীয় উদ্যোক্তা। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, স্পন্সর ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়।

ওরিয়ন লিমিটেড, বেকো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, জিতা গার্মেন্টস লিমিটেড, পূর্বাচল ড্রিলার্স লিমিটেড, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মোহাম্মদ বশির এন্ড কোংসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তিনি হাজার হাজার বেকার মানুষের মুখে জীবিকার হাসি ফুটিয়েছিলেন। বরুড়ার অনেক পরিবার আজও সেই কথা মনে করে চোখের জল মোছে।

পিতার পথ ধরে পুত্রের হাঁটা

পিতা যে পথে হেঁটেছিলেন, সেই পথেই হাঁটলেন পুত্র আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক হিসেবে দলের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পিতার দেখানো পথেই দেশের ব্যাংকিং খাতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের ভবনের মালিক হিসেবেও তিনি দলের পাশে থেকেছেন নিরন্তর।

পিতার মতোই হাজারো বেকার যুবকের হাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে দিয়েছিলেন তিনি। অসংখ্য পরিবারে সচ্ছলতার আলো ফুটিয়েছিলেন। বরুড়ার মানুষের কাছে তিনিও ছিলেন পিতার মতোই একজন আপনজন, একজন বিশ্বস্ত মানুষ।

★বছরের শেষ দিনে নিষ্ঠুর বিদায়,

২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। বছরের শেষ দিন। যেদিন মানুষ নতুন বছরের স্বপ্ন দেখে, আনন্দে মাতে, সেইদিনেই হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলেন আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিন। তাঁকে দ্রুত রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে মাত্র ৬০ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি।

মাত্র ৬০ বছর! এই বয়সে মানুষের অনেক কিছু দেওয়ার থাকে। অনেক স্বপ্ন পূরণ করার থাকে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সব থেমে গেল।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী, দুই পুত্র, এক কন্যা এবং বরুড়ার অসংখ্য শোকাহত মানুষ।

★দুই বিদায়, একই বেদনা,

পিতা এ কে এম আবু তাহের ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ৭২ বছর বয়সে চলে গেলেন। সেদিন বরুড়া কেঁদেছিল। আর ঠিক বিশ বছর পরে, ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর, সেই পিতারই পুত্র মাত্র ৬০ বছর বয়সে চলে গেলেন। এবার বরুড়া আবার কাঁদল।

পিতা চলে যাওয়ার পর বরুড়ার মানুষ সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছিল পুত্রের মধ্যে। কিন্তু সেই পুত্রও চলে গেলেন। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। এই বেদনা ভোলার নয়।

★অপূর্ণ স্বপ্নের আকুল আবেদন,

মরহুম এ কে এম আবু তাহের তাঁর নিজ গ্রাম সোনাইমুড়ীতে গড়ে গেছেন বিশ শয্যাবিশিষ্ট একটি মেডিকেল সেন্টার। গ্রামের দরিদ্র মানুষ যেন অসুখে-বিসুখে চিকিৎসাসেবা পায়, সেই মায়ার টানেই তিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সেই মেডিকেল সেন্টারটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।

বরুড়ার মানুষের তাই একটাই আকুল প্রার্থনা। পিতার এই অসম্পূর্ণ স্বপ্নটি পূরণ করুন। মরহুম আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিনের স্মৃতিকে সম্মান জানান। তাঁর বড় ভাই, বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জনাব জাকারিয়া তাহের সুমনের নিকট এলাকাবাসীর আন্তরিক আবেদন, পিতার সেই স্বপ্নের মেডিকেল সেন্টারটি অতি দ্রুত চালু করুন। এটি শুধু একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি পিতার ভালোবাসার স্মৃতিস্তম্ভ। এটি চালু হলে প্রতিটি রোগী সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি পিতা ও পুত্র উভয়ের রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবে।

★স্মৃতিতে চিরজীবিত, পথে পথে অমর,

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কুমিল্লার লালমাই-বরুড়া-জগতপুর আঞ্চলিক সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে “মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সড়ক”। প্রতিদিন এই পথে হাঁটতে হাঁটতে বরুড়ার মানুষ তাঁকে মনে করে। চোখ ভিজে আসে। বুকের ভেতর চিনচিন করে ওঠে।

আবু তাহের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আজও বরুড়া অঞ্চলে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা চলছে। দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ হচ্ছে ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী। এভাবেই মৃত্যুর পরেও পিতা বেঁচে আছেন বরুড়ার মানুষের প্রতিদিনের জীবনে।

★পিতার আদর্শে পুত্রের পথচলা,

পিতার মৃত্যুর পর বরুড়ার রাজনীতির হাল ধরেছেন জ্যেষ্ঠ পুত্র জনাব জাকারিয়া তাহের সুমন। কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে তিনি পিতার রেখে যাওয়া আদর্শ বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। এখন তাঁর ওপরই রয়েছে ভাইয়ের শোক বহনের পাশাপাশি পিতার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ করার দায়িত্ব।

★পরিশেষে দুটি প্রার্থনা, একটি অঙ্গীকার,

বরুড়ার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে পিতা এ কে এম আবু তাহের এবং পুত্র আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া শারমিন চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের কীর্তি কোনোদিন মুছে যাবার নয়।

মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে একটাই প্রার্থনা, পিতা ও পুত্র উভয়কেই জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন। তাঁদের কবরকে নূরে আলোকিত করুন। আর তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শকে এই উম্মতের বুকে চিরজীবিত রাখুন। আমিন।

প্রতিবেদন : মোঃ আনজার শাহ
বরুড়া, কুমিল্লা, বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *