নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ফার্মিক স্টিল লিমিটেডের কারখানায় গলিত লোহা ছিটকে দগ্ধ হয়ে চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। নিহত শ্রমিক শরিফুল ইসলামের বাবা মো. সেলিম বাদী হয়ে জোরারগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলাটি গ্রহণ করা হয়। তবে মামলা হলেও নিহতদের মরদেহ নিতে এখনো পরিবারের কেউ আসেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফার্মিক স্টিলের একটি ফার্নেসে ত্রুটি দেখা দিলে সেখান থেকে গলিত লোহা ছিটকে চারজন দগ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে শ্রমিক শরিফুল ইসলাম ও চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হংকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
দগ্ধ চারজনের মধ্যে চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেন (২৭) মারা গেছেন। আহত অপর শ্রমিক জুয়েল (৩৬) বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হালিম বলেন, দুর্ঘটনায় দগ্ধ চারজনের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। নিহত শরিফুলের বাবা একটি মামলা করেছেন, যা অপমৃত্যু মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মরদেহ হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, এটি কোম্পানি ও ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যকার বিষয়। পুলিশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় জোরারগঞ্জ থানায় শরিফুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফার্মিক স্টিলের চীনা ও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। নিহতের চাচা মনির হোসেন জানান, দোভাষীর মাধ্যমে বৈঠকে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শরিফুলের বাবা মো. সেলিম বলেন, ছেলে হারিয়ে তাদের পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। মামলা চালানোর সামর্থ্য তাদের নেই। তারা মামলা নয়, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৩ চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, ঘটনাটি দুর্ঘটনা এবং এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কারখানা কর্তৃপক্ষ ফার্নেসের ত্রুটির কথা বললেও তদন্ত ছাড়া দুর্ঘটনার দায় কার, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি ফার্নেসটি কখন ও কোথা থেকে আনা হয়েছে, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিস্ফোরণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সনদ পরীক্ষা করা দরকার।
মোহাম্মদ আলী শাহীন আরও বলেন, এর আগে কারখানায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি না, ঘটলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ চিহ্নিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।