খুলনা প্রতিনিধি:
চায়ের দোকানে বসে চা বানাচ্ছেন আয়েশা আক্তার মেঘলা। ২২ বছরের এই তরুণীর চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। ড্রাইভিং শিখেছেন, লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান তিনি।
পড়াশোনার ফাঁকে এসব কর্মযজ্ঞ। রীতিমতো সংগ্রামী জীবন তার। শরতের মেঘের মতো মেঘলার মনও মাঝেমধ্যে ফিরে যায় নিজের গ্রামে—পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের গাজীপুরে। সেখানে ছিল তার শৈশব, পরিচিত রাস্তা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী নিয়ে ছিল এক অন্যরকম পৃথিবী।
ঘূর্ণিঝড় সিডর কেড়ে নিয়েছিল তাদের ঘর। এরপর খুলনায় চলে আসে মেঘলার পরিবার। শহরে এসে কোনো রকমে নতুন ঘর হয়েছে, পানি-বিদ্যুতের সংযোগ হয়েছে, জীবনও কোনোভাবে এগিয়েছে। কিন্তু যে শৈশব হারিয়ে গেছে, তার জন্য মেঘলা এখনো স্মৃতিকাতর।
জলবায়ু পরিবর্তনে মেঘলার মতো উপকূলের বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের ক্ষতির গল্প একই। তবে এসব ক্ষতির অনেক হিসাবই কোনো খাতায় লেখা হয় না।
২০০৭ সালের সিডরের পর মেঘলার মা নাসিমা বেগম দুই সন্তানকে নিয়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে খুলনায় চলে আসেন। খান পরিবারের মেয়ে হিসেবে গ্রামে তাদের সামাজিক পরিচিতি ও সম্মান ছিল। ছিল জমি-জায়গা, আপনজন ও পরিচিত পরিবেশ। শহরে এসে সেই পরিচয়ের মূল্য হঠাৎই হারিয়ে যায়।
নতুন জায়গায় জমি নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে অপমানিত হন নাসিমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আনসার উদ্দিন খান। সেই আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি। ২০০৯ সালে স্ট্রোকে মারা যান তিনি। পরের বছর ক্যান্সারে মারা যান নাসিমার স্বামী মো. আলী মোল্লা। সংসারের দুই প্রধান অবলম্বন হারিয়ে নাসিমার সামনে তখন শুধু টিকে থাকার লড়াই।
অভাবের কারণে বড় ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। খুলনা মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের রেলওয়ের জমিতে ঘর তোলেন তারা। ভৈরব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান দেন নাসিমা। সেই দোকানই হয়ে ওঠে তার সংসারের অবলম্বন। আর সেই সংসার থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘলা। তার চোখে এখন নতুন স্বপ্ন—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
কয়রার বাগালী ইউনিয়নের ময়না আক্তারের গল্পের শুরুটাও একটি দুর্যোগ দিয়ে। ২০০৯ সালের আইলায় তাদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। দিনের পর দিন সড়কে থাকতে হয় পরিবারটিকে। পানি না কমায় দেখা দেয় খাবার পানির সংকট। কলস হাতে অপেক্ষা করতে হতো, কখন পানি নিয়ে ট্রাক আসবে।
কালের কণ্ঠকে ময়না জানান, তার বাবা ঘেরে মাছ চাষ করতেন। জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে গেলে ঘেরের মাছ ভেসে চলে যেত অন্যের ঘেরে। জীবিকার জায়গাটিও একসময় আর নিরাপদ থাকেনি। শেষ পর্যন্ত পরিবারটি চলে আসে খুলনায়। জিরো পয়েন্ট এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় দুই-তিন মাস কাটে। কখনো সিঁড়িঘরে, কখনো বারান্দায়, আবার কখনো কাদা-মাটির মধ্যে রাত কাটাতে হয়েছে।
নতুন জায়গায় এসে ময়নার বাবা রিকশা চালাতেন। একপর্যায়ে তিনিও মারা যান। এখন ময়না থাকেন নতুন বাজার চরে। মা থাকেন ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। গ্রামে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ফেরার মতো ভিটা নেই, জীবিকার নিশ্চয়তাও নেই। দুর্যোগ তাকে শুধু ঘর থেকে সরায়নি; পুরনো জীবনটাকেও মুছে দিয়েছে।
বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নের লাবনী আক্তারের ক্ষত আবার অন্যরকম। ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। সেই স্বপ্ন নিয়েই বড় হচ্ছিলেন। কিন্তু বন্যায় স্কুল বন্ধ হয়েছে, পরিবারের আর্থিক সংকট বেড়েছে। পরে পারিবারিক চাপে বিয়েও হয়ে যায়। একটি একটি করে বন্ধ হয়ে গেছে স্বপ্নের দরজা। তবু মানুষের সেবা করার ইচ্ছাটা বন্ধ হয়নি।
প্যারামেডিক্যাল প্রশিক্ষণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন লাবনী। সফল হননি। তারপরও গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে ছুটে যান। রক্তচাপ মাপেন, ইনসুলিন দেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। সনদ না থাকায় চিকিৎসায় ঝুঁকি রয়েছে, সেটিও জানেন। তার জীবনটাই যেন একটি চলমান গল্প।
লাবনীর উপলব্ধি আরও গভীর—অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়তো কোনো একদিন পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, সেই সময়টা ফিরে আসে না। লাবনীর এখন নতুন স্বপ্ন—তার মতো আর কোনো মেয়ের স্বপ্ন যেন জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে থেমে না যায়।
নাসিমা, মেঘলা, ময়না কিংবা লাবনীর জীবনে ঘর ভেঙেছে, জীবিকা গেছে, জমি হারিয়েছে। এসব ক্ষতির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায়। পুনর্বাসনের প্রকল্প হয়, ক্ষতিপূরণের হিসাব হয়, নতুন ঘর নির্মিত হয়। কিন্তু একটি মেয়ের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের দাম কত? একটি পরিবারের সামাজিক পরিচয় হারানোর মূল্য কত? একটি শিশুর বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা, একজন নারীর অপূর্ণ স্বপ্ন কিংবা পরিচিত মানুষ ও নিরাপদ পরিবেশ হারানোর ক্ষতি কীভাবে মাপা হবে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই সামনে আসে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ বা ‘নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ’।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হাসান হাওলাদার বলেন, বিশ্বব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ১৩ থেকে ২০ মিলিয়ন, অর্থাৎ এক কোটি ৩০ লাখ থেকে দুই কোটি বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে।
অপর এক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে অধ্যাপক হাসান বলেন, খুলনা শহরের বিভিন্ন নগর বস্তির ৬০ শতাংশের বেশি বাসিন্দা জলবায়ু বাস্তুচ্যুত। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে তারা উপকূলীয় এলাকা থেকে এখানে এসেছেন।
বেসরকারি সংস্থা জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জাকির হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা জীবিকা হারানোর হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। অনেকের হারিয়েছে সামাজিক মর্যাদা, পরিচয় ও নিরাপদ জীবন। আমাদের জরিপে দেখা গেছে, খুলনার ২১, ২২ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচ হাজার ৩৯০টি পরিবারের প্রায় ৮০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। তাঁদের মধ্য থেকে ১৫০টি পরিবারের নারী ও যুব নারীদের নিয়ে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ প্রকল্পটি পরিচালনা করছি।’
নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না—এমন ক্ষতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটিই তারা দেখছেন। তিনি বলেন, একসময় এসব মানুষের অনেকেরই গ্রামে ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক মর্যাদা ও নিজস্ব পরিচয়। কিন্তু শহরে এসে তাদের পরিচয় অনেকের ক্ষেত্রেই দাঁড়িয়েছে শুধু—‘বস্তিবাসী’।