বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, গর্ভবতী মায়েদের কান্নায় ভারী মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিক, নীরব কর্তৃপক্ষ

মোঃআনজার শাহ

চারদিকে বিদ্যুতের আলো ঝলমল করলেও অন্ধকারে ডুবে আছে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিক এবং নোঁয়াগাও । বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, নেই কার্যকর ওয়াশরুম সুবিধা। অথচ এই ক্লিনিকেই প্রতিদিন স্বাস্থ্যসেবার আশায় ছুটে আসেন শত শত রোগী বিশেষত অসহায় গর্ভবতী মায়েরা। রাষ্ট্রের অর্থে নির্মিত এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি আজ মৌলিক সুবিধার অভাবে পরিণত হয়েছে এক যন্ত্রণার ঠিকানায়। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততায় দিনের পর দিন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ক্লিনিকের হাল, চারপাশে বিদ্যুৎ, ভেতরে অন্ধকার,কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ১৩ নম্বর আদ্রা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিকটি এবং নোঁয়াগাও ২নং ওয়ার্ড স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কুমিল্লার বাস্তবায়নে নির্মিত হয়েছিল এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্লিনিকের আশপাশের এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও ক্লিনিকটিতে আজও পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। নেই একটি সাধারণ ফ্যানের ব্যবস্থাও। গরমের দিনে অসুস্থ রোগীদের নিয়ে সেবাদানকারীদের কাজ করতে হচ্ছে অসহ্য গুমোট পরিবেশে।

স্বাস্থ্য পরিদর্শকের মুখেই বেরিয়ে এল দুর্দশার কথা,ক্লিনিকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত স্বাস্থ্য পরিদর্শক নাসিমা আক্তার এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে জানান,

“আমি এই ক্লিনিকে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছি। আশপাশে বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও ক্লিনিকে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই ফ্যানের ব্যবস্থা। এর ফলে গর্ভবতী মায়েদের সেবা প্রদানে প্রতিনিয়ত মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।”

একজন স্বাস্থ্যকর্মী নিজেই যখন সমস্যার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তখন সহজেই অনুমান করা যায় পরিস্থিতি কতটা গভীর সংকটে পৌঁছেছে। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

গর্ভবতী মায়ের আকুতি ‘পানির জন্য দূরে যেতে পারি না’,এই প্রতিবেদকের সামনে চোখের জল আর বুকের কষ্ট একসঙ্গে ঢেলে দিলেন ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা গর্ভবতী মা তামান্না আক্তার। তিনি বলেন,”আমরা যখন সেবা নিতে আসি, পানি চাইলে পানি পাই না। ওয়াশরুম ব্যবহার করতে গেলেও পানি নেই। বহু দূর থেকে পানি আনতে হয়। আমরা গর্ভবতী মা এই অসুস্থ শরীর নিয়ে পানির জন্য এত দূর যেতে পারি না।”

তামান্না আক্তারের এই আকুতি কেবল একজন নারীর কথা নয় এটি এই ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা প্রতিটি অসহায় গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিনের যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি। চিকিৎসা নিতে এসে পানির অভাবে মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের যা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

যা থাকার কথা, যা নেই,সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, কার্যকর ওয়াশরুম সুবিধা এবং প্রসূতিসেবার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিকে এর কোনোটিই নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে রোগী দেখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। পানি না থাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। ওয়াশরুম সুবিধা না থাকায় গর্ভবতী মায়েরা পড়ছেন চরম বিড়ম্বনায়। সামগ্রিকভাবে ক্লিনিকটি এখন নামেমাত্র একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

 

কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ,এখনই পদক্ষেপ নিন,মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিকের এই দুর্দশা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গর্ভবতী মা যদি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেও মৌলিক সুবিধা না পান, তাহলে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের সব উদ্যোগ ও বিনিয়োগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

স্থানীয়রা দাবি জানাচ্ছেন,প্রথমত, অবিলম্বে মন্দুক কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগ ও ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্লিনিকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও কার্যকর ওয়াশরুম সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, গর্ভবতী মায়েদের সেবায় প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ করতে হবে।

বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লা এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে এলাকাবাসী ও সাংবাদিক মহলের আন্তরিক প্রত্যাশা এই প্রতিবেদনটি পাঠের পর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে মন্দুকের অসহায় গর্ভবতী মায়েরা আর কষ্ট না পান।

ক্লিনিকের কর্মী থেকে স্থানীয় বাসিন্দা,সবার মুখে একই হাহাকার,

অত্র প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত সিএইচসিপি মো. নাজমুল হাসান এই প্রতিবেদকের কাছে গভীর হতাশার সঙ্গে জানান,”আমি এই ক্লিনিকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আছি। কিন্তু যেদিন থেকে এখানে যোগ দিয়েছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বা বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা দেখিনি। এর ফলে গর্ভবতী মায়েরা প্রতিদিন অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছেন।”

শুধু কর্মীরাই নন, এলাকার সাধারণ বাসিন্দারাও একই সুরে কথা বলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভের সঙ্গে জানান,

“এই ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা এখানে কোনো দিন বিদ্যুৎ সংযোগ দেখিনি, পানির ব্যবস্থাও দেখিনি। বছরের পর বছর ধরে এই অবস্থা চলে আসছে, অথচ কোনো সমাধান নেই।”**

কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের এই একতারস্বর সাক্ষ্য স্পষ্ট করে দেয় যে, সমস্যাটি সাম্প্রতিক নয়, এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলা ও উদাসীনতার ফল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিন ধরে বিষয়টি জেনেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে তাদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *