চাঁদাবাজি, গুম ও হত্যার অভিযোগে সাবেক ডিআইজি আনিসুরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) ও রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আনিসুর রহমানকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আনিসুর রহমান ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত যশোরের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে খুন, গুম, ক্রসফায়ার, মিথ্যা মামলা ও চাঁদাবাজিসহ নানা গুরুতর অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের একটি অংশের কাছে তিনি ‘সন্ত্রাসী এসপি’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে অন্তত আটটি মামলা হয়েছে। খুন, গুম ও গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান। এ ছাড়া তার নির্দেশে মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলা কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে চার মামলা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনিসুর রহমান যশোরের পুলিশ সুপার থাকাকালে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারে হত্যা ও গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সে সময় ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাননি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট মনিরামপুরের জয়পুর গ্রামের আবু সাঈদকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করা হয়। এতে আনিসুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। একই বছরের ২১ আগস্ট একই গ্রামের পল্লিচিকিৎসক বজলুর রহমান ও আনিসুর রহমানকে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। এ ছাড়া মনিরামপুরের তাহেরপুরের ইউসুফ আলীকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগেও মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আনিসুর রহমানসহ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা আসামি।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ ইকবাল বলেন, চারটি মামলায় সাবেক এসপি আনিসুর রহমানসহ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।

ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে আহত করার অভিযোগ

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনের সময় যশোরের চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে পুলিশ গুলি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় আনিসুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী রুহুল আমিন জানান, মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করেন।

তিনজনকে গুম করার অভিযোগ

পিরোজপুরের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল সাইদুর রহমান ও শাওন নামে দুই যুবককে যশোর পৌর পার্ক থেকে তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট বিএনপির কর্মী মাসুমকে যশোর শহরের নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগেও আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হয়রানি, নয় বছর পর খালাস

প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, জঙ্গি দমনের নামে আনিসুর রহমানের সময়ে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজনকে আটক দেখিয়ে মামলা দেওয়া হতো। এসব অভিযানের কারণে অন্তত চারটি পরিবারের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ নয় বছর পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজল।

২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় চোখ বেঁধে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং একপর্যায়ে তাকে জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত তাকে ওই মামলা থেকে খালাস দেন।

মেহেদীর আইনজীবী মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, আসামিকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা করেছেন। আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তিনি খালাস পেয়েছেন।

প্রতিবাদ করায় মানবাধিকারকর্মীকে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনিসুর রহমানের নির্দেশে রাতে যশোর শহরের গাড়িখানা রোডের প্রায় ৪০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে পুলিশ। এ সময় লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় ২০১৭ সালে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিককে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তার ছেলেকেও মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বলে দাবি করেন বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক।

তিনি বলেন, আনিসুর রহমান নিজেকে ‘সন্ত্রাসী এসপি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার করেছেন। তার নির্যাতন থেকে কেউ রেহাই পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিনয় কৃষ্ণ মল্লিকের দাবি, আনিসুর রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে যশোরে মানবাধিকার পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটে। তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তিনি নিজে কারাবরণ করেছেন এবং তার ছেলেকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *