সাঈদ মৃধা:
রাজধানীর অভিজাত এলাকা উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে “মিলিনিয়াম সিকিউরিটি সার্ভিসেস” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরির নামে ব্যাপক প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। আকর্ষণীয় বেতন ও সহজ শর্তে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেকার যুবকদের কাছ থেকে জামানত ও ট্রেনিং ফি বাবদ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ করে অফিস বন্ধ করে উধাও হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের দাবি, জমজম টাওয়ারের উত্তর-পূর্ব পাশে বারি নং-২৪-এর একটি ইউনিটে ভাড়া নেওয়া ওই অফিসে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। অফিসে রিসেপশনে সুন্দরী তরুণীদের বসিয়ে, ফেসবুক ও পোস্টারের মাধ্যমে “১৮-২০ হাজার টাকা বেতনে সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ” শিরোনামে চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল তরুণদের ঢাকায় এনে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীরা জানান, চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৫ হাজার টাকা জামানত, ৩ হাজার টাকা ইউনিফর্ম খরচ এবং ২ হাজার টাকা ট্রেনিং ফি—এভাবে ধাপে ধাপে মোট প্রায় ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হতো। এরপর ২-৩ দিনের “ট্রেনিং” নামের একটি প্রহসনমূলক প্রক্রিয়ায় অফিসে বসিয়ে রাখা হতো। পরে জানানো হতো “পোস্টিং লেটার” প্রস্তুত হচ্ছে, শিগগিরই চাকরিতে যোগ দিতে পারবে তারা।
নীলফামারী থেকে আসা ভুক্তভোগী সাগর ইসলাম বলেন,
“আমার কাছ থেকে মোট ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। প্রথমে বলছিল চাকরি নিশ্চিত, শুধু ট্রেনিং করতে হবে। তিন দিন বসিয়ে রাখার পর দেখি অফিস বন্ধ। ফোনও বন্ধ, কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।”
একই অভিযোগ করেন ময়মনসিংহের রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন,
“আমাদের মতো ৩০-৩৫ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। মোট টাকার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ টাকার বেশি হবে। এখন আমরা সবাই পথে বসেছি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ওই ঠিকানার অফিসটি তালাবদ্ধ। দরজায় কোনো নোটিশ নেই। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় ১৫-২০ দিন ধরে অফিসটি নিয়মিত খোলা থাকলেও গত দুই দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। অনেকেই ধারণা করছেন, টাকা সংগ্রহের পরপরই চক্রটি এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
স্থানীয় এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রথমদিকে অনেক তরুণ আসত। তারা বলত চাকরি পাবে। পরে হঠাৎ করেই লোকজন কমতে শুরু করে। এখন একেবারে বন্ধ।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চক্রের মূল ব্যক্তি নিজেকে “এইচআর ম্যানেজার জাহিদ” হিসেবে পরিচয় দিত। তবে অনুসন্ধানে এই নামে কোনো বৈধ কর্মী বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র, যারা ভুয়া পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভুক্তভোগীরা এখনো লিখিত অভিযোগ জমা দেননি। তবে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
“চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়টি আমরা শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাগরিকদের এ ধরনের ফাঁদে না পড়ার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।”
পুলিশ আরও জানিয়েছে, রাজধানীতে চাকরির নামে প্রতারণা চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা মূলত জামানত ও ট্রেনিং ফি-এর নামে টাকা হাতিয়ে নেয়।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জামানত বা ট্রেনিং ফি আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চাকরির নামে টাকা নেওয়া হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত নিকটস্থ থানা বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে টাকা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি রাজধানীতে এ ধরনের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।