স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তরুণ সমাজ। দেশের জনসংখ্যাগত বিন্যাস বিবেচনায় বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনাময় সময় অতিক্রম করছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেকারত্বের বোঝা বহন করছে। বিভিন্ন সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, দেশে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারের সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার। তাঁদের মধ্যে স্নাতক ও উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এ ছাড়া প্রায় ৮২ লাখের বেশি তরুণ-তরুণী পড়াশোনা, চাকরি কিংবা কর্মমুখী প্রশিক্ষণের কোনো পর্যায়েই যুক্ত নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরে।
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার তরুণ উচ্চশিক্ষার সনদ নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তাঁদের অনেকেই উপযুক্ত চাকরি কিংবা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। ডিগ্রি অর্জনের পর বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকা, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বেকারত্বকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে রাষ্ট্র, সমাজ ও তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে হলে যুবসমাজকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন তরুণদের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়াকে সফলতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের পক্ষে সব নাগরিকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। ফলে শুধু চাকরি খোঁজার প্রচলিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজে কিছু তৈরি করা, অর্থাৎ উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অলসভাবে সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজের অবস্থান থেকেই ছোট পরিসরে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নিতে হবে।
কেবল শিক্ষাগত সনদ কিংবা অনার্স-মাস্টার্সের ডিগ্রি অর্জন করলেই বেকারত্ব বা দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, যদি সেই শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা না থাকে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন ছাড়া শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমানো কঠিন। একজন তরুণকে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে প্রথমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কোন কাজের চাহিদা রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই কাজে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নিজের কাজের নমুনা ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রম্পট তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার ও অ্যাপ তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর বিপণন এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মতো খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই নয়, আধুনিক কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতেও দক্ষ তরুণদের কাজের সুযোগ রয়েছে। তাই ব্যর্থতার আশঙ্কায় পিছিয়ে না থেকে নতুন দক্ষতা অর্জন ও কাজের ক্ষেত্র তৈরিতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
দেশের যুবসমাজকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কম্পিউটার পরিচালনা, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, আধুনিক মৎস্য চাষ, পোশাক তৈরি, মোটর মেকানিক, ইলেকট্রনিকস ও ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তা তৈরিতে যুব ঋণ, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির মাধ্যমে অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং নতুন উদ্যোগে সহায়তার মতো কার্যক্রমও রয়েছে। এসব উদ্যোগ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফল ও কার্যকারিতা নিয়ে আরও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, পাঠ্যসূচি ও ব্যবহারিক সরঞ্জাম আধুনিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে একজন তরুণ চাকরি পেলেন কি না, নিজে কোনো ব্যবসা বা উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারলেন কি না, কিংবা আগের মতোই বেকার রয়ে গেলেন কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একইভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও দাপ্তরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রচার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য সরকারি সহায়তা ও কার্যকর বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশাল এই যুবসমাজকে কর্মহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে দক্ষ ও স্বাবলম্বী শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বপ্রথমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও যুগোপযোগী করতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পকারখানা, ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। এতে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা সহজ হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রচলিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, উন্নত ড্রাইভিং ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা, নার্সিং এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের চাকরি, আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরুর আনুষ্ঠানিকতা সহজ করা, জামানতমুক্ত বা স্বল্প জামানতের স্বল্প সুদের ঋণ এবং সরকারি স্টার্টআপ তহবিলের সুবিধা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় দাপ্তরিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তরুণদের কাজের সংযোগ ঘটাতে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সাশ্রয়ী ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও দূরবর্তী কর্মীদের বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রেও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত কারিগরি সনদের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের জন্য বিদেশে তুলনামূলক ভালো বেতনের পেশায় কাজের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে একদিকে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে দেশের রেমিট্যান্স আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিশেষে মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের এই সুবর্ণ সুযোগ কোনো দেশের ইতিহাসে চিরকাল থাকে না। তাই সময় থাকতে তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তরুণ সমাজ কোনো দেশের অর্থনৈতিক বোঝা নয়; বরং সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিগরি দক্ষতা, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই তরুণ জনগোষ্ঠীই হয়ে উঠবে আগামীর উন্নত, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।