স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার আলোচনায় এসেছেন রাজউকের দুই কর্মচারী—বি এম কাইয়ুম এবং মোশাররফ হোসেন। তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ থাকার কথা জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের পরও তাঁরা নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বি এম কাইয়ুম বর্তমানে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (এস্টেট-৪) পদে এবং মোশাররফ হোসেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (স্কাই-তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ডিজাইন) পদে কর্মরত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, বি এম কায়ুম দেদিদ্বর উপজেলার লতিফা খাতুনের ছেলে এবং মোশাররফ হোসেন পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার গুলশান বেগমের ছেলে।দুদকের পুরোনো নথিতে রাজউকের দুর্নীতির অভিযোগ
এই দুই কর্মচারীকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২০২৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, ১ সেগুনবাগিচা, ঢাকা থেকে ২৬ জুন ২০২৩ তারিখে একটি নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশটির বিষয় ছিল—অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ প্রসঙ্গে।
নোটিশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ৮ বিধির উল্লেখ রয়েছে।
এতে বলা হয়, রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে।
অনুসন্ধান টিমে নেতৃত্বে ছিলেন একজন কর্মকর্তা এবং সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপপরিচালক জেসমিন আক্তার ও উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নিতে দুদকের নির্দেশনা
দুদকের ওই নোটিশে অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে কর্মকর্তাদের দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও টিআইএন সার্টিফিকেটের কপি সঙ্গে আনার কথাও উল্লেখ ছিল।
অর্থাৎ, ২০২৩ সালে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক তাঁদের বক্তব্য গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিল।
তবে উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণের জন্য নোটিশ দেওয়া মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। একইভাবে, ওই নোটিশে বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের নাম ছিল কি না, তা সরবরাহ করা নথির অস্পষ্ট অংশ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগের পরও বহাল—প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এরপরও তাঁরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না কিংবা অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী—এসব বিষয় জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠেছে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব কী? অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না? অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না?
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদক ও রাজউক প্রশাসনের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
১. বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী?
২. তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি?
৩. ২০২৩ সালের দুদকের অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল?
৪. অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী?
৫. অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি?
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা প্রভাব যেন কাজ না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
দুদক এবং রাজউক প্রশাসনের কাছে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
জনস্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।