নিজস্ব প্রতিনিধি: বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি হস্তান্তরে সহযোগিতা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তের দাবিতে বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সৈয়দা নুজাহাত সুলতানা।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বগুড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। এর আগে গত সোমবার নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও একই অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, স্বামী সৈয়দ জয়নাল আবেদীনের মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ একটি সম্পত্তি অন্যের নামে নিবন্ধন করা হয়েছে, যদিও বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন ছিল এবং একাধিক দেওয়ানি ও আপিল মামলা চলমান রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সম্পত্তি নিয়ে আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ থাকা সত্ত্বেও নির্মাণাধীন ভবনের ফ্ল্যাট, দোকান ও শোরুম হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সৈয়দা নুজাহাত সুলতানা বলেন, আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং রেজিস্ট্রি অফিসে আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একই সম্পত্তি অন্যের নামে নিবন্ধনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও গ্রাহকদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর উপজেলায় অনিমেষ পালের পরিবারের নামে প্রায় ৩২৫ শতক জমি রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। এসব সম্পত্তি তাঁর বাবা অসিত কুমার পাল ও মা গীতা পালের নামে নিবন্ধিত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব ও সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শেরপুর উপজেলার খেরুয়া এলাকায় ২৪ শতাংশ জমি কেনার বিষয়েও অনিমেষ পালের নাম এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই জমির দলিল নিবন্ধনে তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট অফিস সহকারী জালাল মিয়া বলেন, দলিল সম্পাদনে তিনি সহযোগিতা করেছেন, তবে জমিতে তাঁর কোনো অংশীদারিত্ব নেই।
এদিকে একটি বিচারাধীন মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে দুটি ভিন্নধর্মী তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদনে ১৯৫৬ সালের একটি ভলিউম না থাকার কথা বলা হলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে সেটি থাকলেও অধিকাংশ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় আদালত অসঙ্গতির ব্যাখ্যা চেয়ে সাব-রেজিস্ট্রারকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, দলিলের জাল সার্টিফায়েড কপি তৈরি ও মূল নথি পরিবর্তনের অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যেই পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পাল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরদিন তাঁর কার্যালয়ে গেলে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও ওঠে।
বগুড়ার জেলা রেজিস্ট্রার সিরাজুল ইসলাম বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কর্মরত জেলায় ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌশিকুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।