অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, খুলনা সদর হাসপাতালের আউটডোরে টিকিট মিললেও মিলছে না ভ্যাকসিন

খুলনা প্রতিনিধি: 

খুলনা সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে (আউটডোর) টিকিট সংগ্রহ করেও প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়ম ও সম্ভাব্য দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও দরিদ্র পরিবারের রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। খুলনার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এমন ঘটনা আর কতদিন চলবে—এমন প্রশ্ন তুলছেন রোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।

খুলনা সদর হাসপাতাল (২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল) প্রতিদিন শত শত রোগীর চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল। এখানে মাত্র ১০ টাকায় টিকিট কেটে সহজেই চিকিৎসক দেখানো যায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন চিকিৎসক শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জন্য সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন—যেমন পিসিভি, আইপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট, এমআরসহ বিভিন্ন টিকা লিখে দেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীরা টিকা কার্ড নিয়ে হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে গেলে সেখানে গিয়ে জানতে পারেন—ভ্যাকসিন নেই, মজুত শেষ কিংবা সরবরাহ বন্ধ। এতে একদিকে রোগীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুদের টিকাদানের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশজুড়েই টিকা সংকট, খুলনাও ব্যতিক্রম নয়

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের টিকার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের শুরু থেকে অন্তত ৩০টি জেলায় পিসিভি, আইপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট ও এমআর টিকার ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুলনা সদর হাসপাতালেও। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, তবে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কেন আগাম সতর্কতা নেননি বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

টিকিট কেটে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে

ভুক্তভোগী অনেক রোগী অভিযোগ করেন, টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর পরও ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক বা ফার্মেসি থেকে উচ্চমূল্যে টিকা কিনছেন। এতে বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলোর, যা তাদের জন্য কার্যত অসহনীয়।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইপিআইয়ের আওতায় শিশুদের টিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা না পাওয়ায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

অতীতেও ছিল একই চিত্র

খুলনা অঞ্চলে অতীতে করোনা ভ্যাকসিন বিতরণের সময়ও অনুরূপ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। টিকা কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়, সরবরাহ সংকট ও বিতরণে অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকেই খালি হাতে ফিরে গেছেন। বর্তমানে শিশুদের টিকাদানে একই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে দেশের রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

টিকাদান শিশুমৃত্যু হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এমন অবহেলা ও গাফিলতি জাতীয় পর্যায়ের সব অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবেই কেন্দ্রীয় ডিপোতে টিকার চাহিদা পাঠালেও সময়মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও স্টক ম্যানেজমেন্টে অদক্ষতা, আবার কোথাও অগ্রাধিকার নির্ধারণে ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্ব বা লজিস্টিক সমস্যাও দায়ী হতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যখন হাসপাতালে টিকা নেই, তখন কেন চিকিৎসকরা রোগীদের টিকার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং টিকিট কাটতে বাধ্য করছেন? এতে রোগীরা অকারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্রুত সমাধানের দাবি

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলা সিভিল সার্জন ও খুলনা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অবিলম্বে টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। টিকা সংকট থাকলে আউটডোরে তা স্পষ্টভাবে জানানো এবং রোগীদের আগাম অবহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সমাধান কবে?

খুলনার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সদর হাসপাতালও এর বাইরে নয়।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই অনিয়ম ও দুর্নীতি আর কতদিন চলবে? সরকারি স্বাস্থ্যসেবা যেন সত্যিকার অর্থেই জনগণের সেবায় পরিণত হয়, সেজন্য এখনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর তদারকি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। অন্যথায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হতেই থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *